সাক্ষাৎকার ~ সাজিদ হোসেন

থার্ড লেনের পক্ষ থেকে সাজিদ হোসেনের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন 

অর্কপ্রিয়া দাস

থার্ড লেনঃ  ‘যুদ্ধশিশু’ এই বিষয়টি নিয়ে সেইভাবে আলোচনা দেখা যায় না। এই বিষয়টি নিয়ে কাজ করার কথা আপনার ভাবনায় প্রথম আসে কিভাবে?

সাজিদ হোসেনঃ  মুক্তিযুদ্ধের সময়ে, ১১/১২ বছর বয়সের অপক্ক চেতনাতেই বুঝতে হয়েছিল ‘পাকিস্তানী সেনাদের ধর্ষণলীলা’। জেনেছিলাম, আমার এক নিকটাত্মীয়ের ধর্ষিতা হওয়ার কথা। যুদ্ধের পরে, আমার মা (মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপিকা জান্নাতুল ফেরদৌস)-সহ কয়েকজনের প্রয়াসে পাবনায় প্রতিষ্ঠিত ‘বীরাঙ্গনা হাসপাতাল’-এর এক নার্স (দেলোয়ারা বেগম) প্রায়ই আসতো আম্মার কাছে। তাদের আলাপ থেকেই প্রথম জানতে পারি ওই হাসপাতালে জন্ম নেয়া ‘যুদ্ধশিশু’-দের কথা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বই, পত্র-পত্রিকা ও ইন্টারনেট থেকে এসম্পর্কে আরো তথ্য জানতে পারি। এ পর্যন্ত প্রকাশিত আমার মোট ২৩টি বইয়ের প্রথম বই ‘একাত্তরের প্রমিথিউস (২০০০)’ প্রকাশ করার পর ‘লেখক’ হিসাবে আত্মবিশ্বাস জন্মে। এরপর শুরু করি যুদ্ধশিশু সম্পর্কে গবেষণা।  

থা. লেঃ আপনার সঙ্গে আলাপচারিতায় জেনেছিলাম যে রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের একটি সংগঠন এই যুদ্ধশিশুদের নিয়ে কাজ করে, তাদের কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে যদি বলেন।

সা. হো: আমি রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের একজন এক্স-ক্যাডেট (১৯৭২-১৯৭৮; ৭ম শ্রেণী থেকে ১২শ শ্রেণী)। কলেজের এক্স-ক্যাডেটদের সংগঠন- Old Rajshahi Cadets’ Association (ORCA)। চট্টগ্রামে বসবাসকারি রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের এক্স-ক্যাডেটরা মিলে ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠা করি অরকা হোমস (ORCA Homes)। তবে, এটা যুদ্ধশিশু নয়, অনাথ-এতিম বাচ্চাদের আশ্রয়কেন্দ্র; এখনো চালু রয়েছে।

থা. লেঃ এই যুদ্ধশিশু নিয়ে আপনার নিজস্ব কি কোনো সংস্থা আছে?

সা. হোঃ না, নেই।

থা. লেঃ একটি প্রশ্ন অনেকসময়ই মনে হয়েছে যে কেন বেশিরভাগ যুদ্ধশিশুকে বাংলাদেশের বাইরে মূলত পশ্চিমের দেশগুলিতে পাঠিয়ে দেওয়া বা দত্তক দেওয়া হয়েছিল? বাংলাদেশের সরকারের তরফ থেকে কি কোন দায়িত্ব নেওয়া হয়েছিল? যেখানে মুজিবুর রহমান নিজে বীরাঙ্গনাদের স্বীকৃতি দিয়েছিলেন, তাহলে সেই স্বীকৃতির ভাগীদার শিশুগুলি কেন হতে পারলনা? রাষ্ট্র কেন এক্ষেত্রে একজন নাগরিকের প্রতি যথাবিহিত যে কর্তব্য তা পালন করলনা, রাষ্ট্রের কি কোনরকম অস্বস্তি কাজ করেছে?

সা. হোঃ আমাদের সামাজিক উদারতার অভাব ছিল; মনে হয় এখনো আছে। সবার কাছে পাকিস্তানী ঔরসে জন্ম নেয়া যুদ্ধশিশুরা ছিল ‘দূষিত রক্তধারী’। বীরাঙ্গনাদের প্রতিও ছিল একইরকম নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। ১৯৭২ সালে ২৬ ফেব্রুয়ারিতে পাবনার নগরবাড়িতে এক জনসভায় (আমি উপস্থিত ছিলাম) জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু বীরাঙ্গনাদেরকে বেলী ফুলের মালা দিয়ে বিয়ে করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। পরে, বঙ্গবন্ধু ও তাঁর স্ত্রী (বেগম ফজিলাতুননেসা মুজিব) মিলে, বীরাঙ্গনাদেরকে তাদের ধানমন্ডির বাড়ির ঠিকানা দিয়েছিলেন। কিন্তু, বীরাঙ্গনাদেরকে বরণ বা গ্রহণে উল্লেখজনক কোনো আগ্রহ/উন্নতি দেখা যায়নি। নারী পুনর্বাসন কেন্দ্রের মাধ্যমে বীরাঙ্গনাদেরকে সমাজে মিলিয়ে দেয়ার কঠিন প্রয়াসে সাফল্য এলেও, যুদ্ধশিশুদের ভাগ্যে মেলে ‘নির্বাসন’! বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হয় ‘যুদ্ধশিশুদের দত্তকায়ন’।

থা. লেঃ এবার আসি কিছু ব্যক্তিগত প্রসঙ্গে। ১৯৭১ সালে আপনার বয়স ছিল ১১, তখন বাংলাদেশের (পূর্ব পাকিস্তান) কোন অঞ্চলে আপনারা থাকতেন?

সা. হোঃ পাবনা জেলার পাবনা সদরে অর্থাৎ পাবনা শহরে। সেখানেই আমার জন্ম এবং বেড়ে ওঠা।

থা. লেঃ ২৫শে মার্চ রাতে আপনাদের অঞ্চলে কি পাকবাহিনী আক্রমণ করেছিল?

সা. হোঃ হ্যাঁ, পাকিস্তানী সেনাবাহিনী পাবনা শহরে আক্রমণ করেছিল। আমাদের বাড়িও আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। তবে, ১৯৭১-এর ১লা মার্চ থেকেই স্কুল বন্ধ থাকার কারণে, ২৪শে মার্চে আমরা তিন ভাইবোন রাজশাহী জেলার নওগাঁ মহকুমার আত্রাই থানায় তারাটিয়া গ্রামে আমাদের নানাবাড়িতে গিয়েছিলাম। ২৫শে মার্চ সন্ধ্যায় আমাদের বাড়ি থেকে আব্বা-আম্মা শহরের অন্যস্থানে আশ্রয় নিয়েছিলেন। আর ওদিকে, নানাবাড়িতে আমরা রেডিও-তে (বিবিসি, আকাশবাণী, ভয়েস অব অ্যামেরিকা ইত্যাদি) ওই আক্রমনের খবর শুনছিলাম। আকাশবাণীতে কিছুক্ষণ পরপর সংবাদ বুলেটিনে বলা হচ্ছিল, ‘ঢাকা শহরকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়া হয়েছে।’ এবং এরপরই নতুন জাতীয় সঙ্গীত, আমার সোনার বাংলা…।   

থা. লেঃ আপনার বাবা-মা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, সেইসময় কি ওনারা কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন?

সা. হোঃ উভয়ই তাদের সারাজীবন আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বাবা (মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট আমজাদ হোসেন; ২০১৫ সনে প্রয়াত) ১৯৪০-এর দশকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘ছাত্রলীগ (আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠন)’ গঠনের উদ্যোগের সময় থেকে তাঁর সংস্পর্শে আসেন এবং রাজনীতির সূচনা হয়। ১৯৭৩-১৯৭৫ সনে সংসদ সদস্য ছিলেন। মা (মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপিকা জান্নাতুল ফেরদৌস; ২০১২ সনে প্রয়াত), পিতার পাশাপাশি ১৯৫০-এর দশক থেকে মহিলা আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৯৬-২০০১ সনে সংসদ সদস্য ছিলেন।      

থা. লেঃ তখন বাংলাদেশের (পূর্ব পাকিস্তান) পরিস্থিতি ভয়াবহ, ঠিক কোন তাড়না থেকে আপনারা ঘর ছেড়ে এক অনিশ্চিত জীবনের দিকে পা বাড়িয়েছিলেন?

সা. হোঃ  যুদ্ধ-পরিবেশে চারদিক চারপাশ, সারাদিন সারাবেলা যুদ্ধের রব। নানাবাড়ি অর্থাৎ তারাটিয়া গ্রামে আমার এক মামা (জনাব মগরেব, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস-এর সেনা সদস্য) চট্টগ্রাম থেকে গ্রামে এসেছিলেন। তিনি প্রশিক্ষণ দেয়া শুরু করেন। আমি আমার সমবয়সীদের নিয়ে যোগ দিয়েছিলাম। কিন্তু, বিনা অস্ত্রের ওই প্রশিক্ষণে স্বস্তি পাচ্ছিলাম না। জুন-জুলাইয়ে বর্ষাকালে (তারিখ মনে নেই) হঠাৎ আমাদের গ্রামে আসে একদল পাকিস্তানী সেনা। প্রায় সবাই নৌকায় করে বিভিন্ন দিকে সরে যায়; আমরাও। দূর থেকে গুলির শব্দ শুনি। পরে জানতে পারি যে, গ্রামের নয় জনকে (সম্পর্কে সবাই আমার মামা) লাইন করে হত্যা করেছে পাকিস্তানী সেনারা। এর কয়েকদিন পরে জানতে পারি যে, অন্য একটা শহরে, আমার এক নিকটাত্মীয়কে তিনমাস ধরে ধর্ষণ করেছে এক পাকিস্তানী মেজর।

আগস্টের সম্ভবত ৬ তারিখে, কয়েকজন মু্ক্তিযোদ্ধা-সহ আব্বা এলেন। আমাদেরকে ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়ার কথায়, আম্মা বলল, এখানে থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করাও দরকার। এখানে-ওখানে সবখানেই অনিশ্চয়তা। কিন্তু, আমি ভাবলাম যে, মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার পথে এটা এক পরম সৌভাগ্য। আমাদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়া, আমার নয় মামাসহ অসংখ্য মানুষকে হত্যা করা, ধর্ষণ করা – ইত্যাদি সবকিছুর প্রতিশোধ নেয়ার এইতো সুযোগ! আমি আম্মাকে বললাম, আমি আব্বার সঙ্গে ক্যাম্পে যাব। আব্বাতো রাজিই! অতএব, চললাম আব্বাদের মধুপুর মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পের পথে; যদিও সেটা ছিল অনিশ্চিত এক অভিযাত্রা।     

থা. লেঃ কোন মাসে আপনারা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করবেন বলে রওনা দেন? প্রথম থেকেই কি আপনারা মধুপুর মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে ট্রেনিং নিতেন?

সা. হোঃ ১৯৭১-এর সম্ভবত ৬ আগস্টে আমরা মধুপুর মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে রওনা দেই। হ্যাঁ, পৌছানোর পরদিন থেকেই আমি ক্যাম্পের ট্রেনিং-য়ে যোগ দেই। আজাদ কমান্ডারকে জানাই যে, পাবনা জিলা স্কুল কাবস-এর লীডার আমি। মার্চ করা, ক্রলিং করাসহ প্রাথমিক বিষয়গুলো জানি। আমাদের সিনিয়র ‘রেঞ্জার’ ভাইরা কাঠের ডামী রাইফেলে ট্রেনিং নিতো। আমরা ছোটরাও মাঝেমধ্যে অংশ নিতাম।

থা. লেঃ আপনি তো তাহলে খুব কাছ থেকে দেখেছেন এই পুরো সময়টা, আপনাদের ক্যাম্পের দিনগুলো কিরকম ভাবে কেটেছে?

সা. হোঃ যে কোনো সময়ে গড়ে প্রায় দুই হাজারের মতো মুক্তিযোদ্ধা থাকতো আমাদের ক্যাম্পে। সবাই তাঁবুতে। বর্গাকার বিশাল মাঠের চারপাশ দিয়ে তাঁবুর সারি। এককোণায় রান্না ও খাবারের স্থান। আরেক কোণায় অফিস। সকাল থেকে অপারেশনের ব্রীফিং সেশন, অস্ত্রের প্রশিক্ষণ, বিকালে ফুটবল খেলা আর সন্ধ্যার পর রেডিওতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান শোনা – এই ছিল প্রাত্যহিক কর্মকান্ড।

থা. লেঃ ক্যাম্পের ভিতরের ব্যবস্থাপনা কেমন ছিল?

সা. হোঃ আমাদের ক্যাম্পটা ছিল রিসেপশন সেন্টার। আগ্রহী মুক্তিযোদ্ধাদেরকে রিক্রুট করে যুদ্ধ-কৌশল প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হত ভারতীয় সেনাদের পতিরাম ক্যাম্পে। সেখান থেকে শিলিগুড়ির একটা জঙ্গলে। সেখানেই হত মূল প্রশিক্ষণ। তারপর ফিরে এসে, ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে, বাংলাদেশের ভেতরে অপারেশনে যেত।

থা. লেঃ মহিলাদের সুরক্ষার জন্য কি ধরনের ব্যবস্থাপনা ছিল?

সা. হোঃ না, মহিলাদের জন্য মধুপুর ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ বা আবাসনের কোনো সুযোগ ছিলনা। মনে পড়ে, একুশ বছর বয়সী এক আপা প্রায়ই আসতেন; বলতেন, এতবড় একটা কর্মযজ্ঞ চলছে, আর আমরা মেয়েরা কোনো ভূমিকা রাখতে পারছিনা! 

থা. লেঃ যদি কোথাও কোন আক্রমণের খবর পেতেন, কি ধরনের তৎপরতা দেখা যেত?

সা. হোঃ আক্রমণের খবরে, তাৎক্ষণিক কোনো উদ্যোগ বা অ্যাকশন নয়, বরং এই ক্যাম্প থেকে পরিচালিত হত – পরিকল্পিত অপারেশন। সুকৌশলে, রেকি ওয়ার্ক করে, নির্দিষ্ট লক্ষ্যে আঘাত হানার জন্য রওনা দিত ‘গেরিলা গ্রুপ’।

থা. লেঃ এই মধুপুর ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধাদের কারা ট্রেনিং দিতেন? এইসব ক্যাম্পে অস্ত্রশস্ত্র কিভাবে যোগাড় হত? ভারত কি এই বিষয়ে সাহায্য করত নাকি EPPF এর থেকেও অস্ত্রসাহায্য পাওয়া যেত?

সা. হোঃ বিমান বাহিনীর একজন অফিসার এবং ইপিআরের একজন সেনা (আজাদ কমান্ডার) ক্যাম্পে প্রাথমিক প্রশিক্ষণ এবং ব্রীফিং দিতেন। জানামতে, অস্ত্র আসতো, রাশিয়া এবং ভারতের কাছ থেকে। এখানেই প্রথম দেখি, রাশিয়ান রাইফেল (যার প্রস্থচ্ছেদ ত্রিকোণাকার)।

থা. লেঃ এই ক্যাম্পে আপনি ছিলেন একজন কিশোর মুক্তিযোদ্ধা, আপনাদের জন্য কি ধরনের কাজ বরাদ্দ ছিল?

সা. হোঃ ক্যাম্পে আমরা চারজন কিশোর মুক্তিযোদ্ধা ছিলাম – ১২ বছরের গিয়াসুদ্দিন (এখন কানাডা প্রবাসী), ১১ বছরের সোহেল (নওগাঁ জেলায় ব্যবসায়ী), আমি এবং ১০ বছরের শরীফ (বর্তমান অবস্থান অজানা)। আমরা ছিলাম ‘ক্যাম্পের বার্তাবাহক’। এখানেও আমার কাবস ট্রেনিংয়ের ‘মেসেজ পাসিং’ কাজে লেগেছিল। নিজ আগ্রহের কারণে, আমি ক্যাম্পের অস্ত্রাগার রক্ষকের সহকারি হয়েছিলাম। অস্ত্র সাজানো, ম্যাগাজিনে গুলি ভরা, অ্যামুনেশন বক্স সাজানো ইত্যাদি কাজ করতাম মহাউৎসাহে! এছাড়া আমরা চারজন ক্যাম্পের হাসপাতালে ডাক্তার-নার্সদেরকেও সহযোগিতা করতাম। 

থা. লেঃ মুক্তিযুদ্ধকালে এমন কোন বিশেষ ঘটনা মনে পড়ে যা আপনার স্মৃতিতে আজও অমলিন?

সা.হোঃ সেপ্টেম্বরে (তারিখটা মনে নেই) ক্যাম্পের গুরুত্বপূর্ণ কাজে আব্বাকে কলকাতায় বাংলাদেশ সরকার অফিসে যেতে হয়। সঙ্গে আমিও! কলকাতায় কয়েকটা দিন আমরা ছিলাম হোটেল শ্রীনিকেতনে। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদের কক্ষে গিয়েছিলাম। এরপর, অর্থমন্ত্রী ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলীর কক্ষে। অতি সাধারণ চেয়ার-বেঞ্চ-টেবিলের কক্ষ। কলকাতার ৮ নম্বর থিয়েটার রোডে বাংলাদেশ সরকার দপ্তর পরিদর্শন আমার জীবনের চির-স্মরণীয় ঘটনা।

আরেকটি ঘটনা স্মরণে আছে, নভেম্বরের দিকে একটা ডকুমেন্টারি নির্মাতা দল আসে আমাদের ক্যাম্পে। সম্ভবত উদ্যোগটা ছিল ক্যাম্পের প্রতিষ্ঠাতা মুক্তিযোদ্ধা আবদুল জলিল (এমএনএ–নওগাঁ) সাহেবের। একটা অপারেশনে আমাদের ক্যাম্পের বাদল ভাই শহীদ হয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যু-দৃশ্যই অভিনয়ে ফুটিয়ে তোলা হবে। আমরা ক্ষুদে-বাহিনী সবার আগে প্রস্তুত! কিন্তু, নির্মাতারা রাজি নন। আমাদের জেদ আর আগ্রহে শেষ পর্যন্ত শুধুমাত্র আমাকে নিতে রাজি হলেন। ক্যাম্পে একটা জীপ ছিল। পাকিস্তানী সেনাদের জীপ; আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা দখল করে এনেছিল। আমরা বলতাম ‘জয় বাংলার জীপ’!

ছোট্ট দৃশ্য। ওই জীপে করে আবদুল জলিল সাহেব একদল মুক্তিযোদ্ধাসহ এসে থামে। সেখানে গুলিবিদ্ধ রক্তাক্ত অবস্থায় শুয়ে আছে ‘বাদল ভাই’-এর অভিনেতা। এই পর্যায়ে আবির্ভূত হই কয়েকজনের সাথে আমিও! জলিল সাহেব এসেই কোলে নিলেন বাদল ভাইকে। বাদল ভাইয়ের সংলাপ, ‘জলিল ভাই, আমি চলে গেলাম। আপনারা দেশ স্বাধীন করবেন। জয় বাংলা।’ এই ভিডিও খুঁজেছি কতখানে, কত জনের কাছে, শেষ পর্যন্ত ২০১৬ সালে পেয়েছি ইন্টারনেটে! আমার সারা জীবনের অনন্য সম্পদ।

থা. লেঃ মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর আপনারা আবার নিজ বাসস্থানে ফিরে এসেছিলেন? আপনার সেখানকার প্রতিবেশী, বন্ধুবান্ধব, পরিবেশ সব কি আগের মতই ছিল?

 

সা. হোঃ বিজয়ের পর, ভারত থেকে ফিরলাম পাবনায়। স্বচক্ষে দেখলাম আমাদের পোড়া বাড়িটা। প্রবেশপথেই দেখি যে, কয়েকটা ছেলে একটা মানুষের মাথার খুলিকে বল বানিয়ে খেলা করছে! সযত্নে মাথাটা হাতে নিয়ে নিলাম। ছেলেরা বলল, বাড়ির ভেতরে আরো আছে। ভেতরে গেলাম। সারাবাড়ি ছেয়ে আছে পুরু ছাইয়ের স্তরে। বারান্দায় পোড়া রেফ্রিজারেটর। উঠানে পেলাম আরো চারটা মাথার খুলি। পাঁচটা মাথার খুলিই উঠানের একপাশের গর্তে মাটিচাপা দিলাম।

আশেপাশের প্রতিবেশিদের সঙ্গে দেখা হল। আবার অনেক বাসায় ফাঁকা। আবার অনেক বাসাতে মু্ক্তিযুদ্ধে শহীদ হওয়ার কথা জানলাম। যেসব বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে, সেসব বাড়ির মানুষেরা আপাতত অন্য বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। যেন, ধ্বংসস্তুপের মধ্যে নতুন করে অঙ্কুরোদগমের প্রয়াস। 

থা. লেঃ আপনার এই সব অভিজ্ঞতা নিয়ে ২০০০ সালে “একাত্তরের প্রমিথিউস” নামক বইটি প্রকাশিত হয়। কিন্তু সেই বইটি ‘প্রকাশের দায়ে’ সাময়িকভাবে বরখাস্ত করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয় এবং আপনার কর্মজীবনেও তার অভিঘাত নেমে আসে। কারা এই কাজের জন্য মূলত দায়ী ছিল এবং আপনার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ আনা হয়েছিল?

সা. হোঃ সেটা ছিল ২০০৩ সাল। বাংলাদেশে সময়টা ছিল বিএনপি-জামাত জোট সরকারের (২০০১-২০০৬)। মুক্তিযুদ্ধের নীতি-আদর্শ এড়িয়ে, দেশ চলছিল উল্টো পথে – পাকিস্তানী ভাবধারায় ফেরার অপচেষ্টা! অতএব, কেন্দ্রীয় প্রশাসন যন্ত্রের নির্দেশনায়, ‘একাত্তরের প্রমিথিউস (২০০০)’ বইটি প্রকাশে ‘পূর্বানুমতি না নেয়া এবং বইটির মাধ্যমে রাজনৈতিক মত প্রকাশের’ অভিযোগ এনে ২০ অক্টোবর ২০০৩ তারিখে আমার বিরুদ্ধে ‘সাময়িক বরখাস্তাদেশ’ জারী করা হয়।   

থা. লেঃ তাহলে কবে আপনি এইসব অভিযোগ ও বরখাস্তাদেশের হাত থেকে অবমুক্তি পেয়েছিলেন?

সা. হোঃ ২০০৩ সালেই ওইসব অভিযোগ ও বরখাস্তাদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রীট আবেদন করি এবং অভিযোগ ও বরখাস্তাদেশের বিরুদ্ধে স্থগিতাদেশ লাভ করি। মামলা চালাতে থাকি। ২০১১ সনে আমার পক্ষে ইতিবাচক রায় লাভ করি এবং সকল অভিযোগ ও বরখাস্তাদেশ থেকে অবমুক্ত করা হয়। আমাকে আমার চাকুরিতে (প্রধান প্রকৌশলী, বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি) পুনর্বহাল করা হয় এবং বেতন-ভাতা বাবদ সমুদয় বকেয়া অর্থ লাভ করি। ধাপে ধাপে কমান্ড্যান্ট (একাডেমির প্রধান) পদে পদোন্নতিও লাভ করি; যে পদে এখনো কর্মরত আছি।  

থা. লেঃ বর্তমানে আপনি কি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কোন নতুন কাজ করছেন?

সা. হোঃ নিয়মিত মুক্তিযুদ্ধের নানাদিক নিয়ে নিবন্ধ লিখে থাকি। এ মুহূর্তে, আসছে বিজয় দিবস উপলক্ষ্যেও লিখছি। আসছে ‘ফেব্রুয়ারি ২০২২ বইমেলায়’ একাত্তরের যুদ্ধশিশু বইয়ের ২য় সংস্করণ প্রকাশের চেষ্টা করছি। কয়েক বছর ধরে একটা বড় পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি – আমার বই ‘একাত্তরের প্রমিথিউস (২০০০)’ এবং ‘ক্যাম্পের কিশোর (২০১৯)’-এর ওপরে ভিত্তি করে একটা তথ্যচিত্র তৈরি করা। বেশ শ্রমসাধ্য, ব্যয়বহুল এবং দক্ষতারও প্রয়োজন। যাহোক, আশা করি কাজটা করতে পারব।  

থা. লেঃ শেষ প্রশ্ন, ১৯৭১ এর পর আর কখনো মধুপুরে গিয়েছিলেন?

সা. হোঃ না, যাওয়া হয়নি। গুগল আর্থে প্রায়ই দেখি সেই গ্রামটা। ক্যাম্পের সেই বিশাল মাঠটা এখনো আগের মতোই আছে! পাশের আঁকাবাঁকা খালটাও আছে। অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষমান – একদিন আবার যাব সেই মধুপুর গ্রামে!

প্রচ্ছদের ছবিঃ মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ

*****