(জ)
খেলাটা কে খেলছে,
খেলনা যে কে?
বিজয়ী কি আসলে বিজয়ী?
চিন্তা করো, চিন্তা করা খুব প্রয়োজন আজ।
রান্তাই উৎসবের ভেঁপু বেজে উঠলো। দলে দলে প্রতিযোগীরা জমায়েত হতে শুরু করলো।চারদিকে দর্শকদের তুমুল করতালি। এবছর একজন রাজকন্যার বিবাহের উপযুক্ত হয়েছেন। মানে বিজয়ীর ভাগ্যে রাজকন্যা জুটবে। দর্শকদের ভিড়ের ভেতর একটা কণ্ঠ বিজবিজ করে বলে উঠলো, বিজয়ী বেচারার জন্য এখনই আমার দুঃখ হচ্ছে। অন্য কেউ বলল, কেন? আগের লোকটা বলল, না এতো বড় শক্তিমান মানুষ অথচ তাকে সতীনের সংসার কোরতে হবে। আগেরজন বলল, মানে? সে তো কুমারী রাজকন্যার বর হবে। লোকটা বলল, রাজকন্যার বিয়ে হবে অন্য রাজ্যের রাজপুত্রের সঙ্গে। রাজপুত্রের সময় থাকে না রাণীকে সময় দেবার তাই আমাদের মতো শক্তিমান সাহসীদের ধরে নিয়ে তাদের উপপতি বানিয়ে রাখে। পুরো ব্যাপারটার মাঝখানে এই উৎসব দুলছে। ফলে জনগণও খুশি আর মহলের ভেতরও ঠাণ্ডা।এক ঢিলে কয়েক পাখি। আগেরজন বলল, যে সন্তান জন্মাবে? লোকটা বিজবিজ করে বলল, তুমি এখনো দুধ ছাড় নি?
উৎসবের একদিক থেকে বলিষ্ঠ যুবকেরা এগিয়ে যেতে লাগলো মঞ্চের দিকে।তাদের জন্য ঘোড়া তৈরী তৈরি আছে। আছে অস্ত্র। এ মুহূর্তে সকলে নিরস্ত্র। রাজা কিছুক্ষণের মধ্যে মঞ্চে আসবেন। আর আসবেন মহাপুরোহিত। যুবতীদের হল্লা শোনা যেতে লাগলো, কামার্ত কথা ছুঁড়ে দিতে লাগলো তারা যুবকদের দিকে।
ভিড়ের একদিক থেকে একটা খাঁচাবাহী গাড়ি এগিয়ে আসতে থাকে ঘর্ঘর শব্দ তুলে। খাঁচায় তিনজন বন্দিকে আনা হচ্ছে। এদেরকে ছেড়ে দেয়া হবে জঙ্গলে। এরা একেবারেই নিরস্ত্র। এই তিনজনের অপরাধগুলো দুর্দান্ত। প্রথমজন এক যুবক যে কেবল তার বয়ঃসন্ধি রেখা পেরিয়ে যৌবনে হাবুডুবু খাচ্ছে। তার অপরাধ, তার গ্রামে রাজার সৈনিক এক কিশোরীকে তুলে নিয়ে যাচ্ছিলো। বর্তমানে এটা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, রাজার সৈনিকেরা তাদের ইচ্ছা মতো মেয়েদের ভোগ কোরতে পারে। কোন মহিলাকে ভালো লাগলো তো হিড়হিড় করে তার ঘরে ঢুকে গেলো দলবল নিয়ে, মহিলার স্বামীকে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।রাজ্যের অবস্থা এমন স্তরে এনে ফেলতে পেরেছে রাজা। ঐ কিশোরী মেয়েটাকে যখন তুলে নিয়ে যাচ্ছিল, মেয়েটা চিৎকার দিতে থাকে, যা শুনে এই যুবক এক মুহূর্ত দেরী না করে, দাউ দিয়ে একটা কোপ বসিয়ে দেয় সৈনিকের ঘাড়ে। গ্রামের লোকেরা মজা করে বলে দৃশ্যটা খুব সুন্দর ছিল যে, রাজার সৈনিকের ধড়ের সঙ্গে মাথাটা ঝুলছিল নোড়লিকে আঁকড়ে। ফলে সৈনিকের দেহটা মিনিট খানেক বা কয়েক সেকেন্ড হয়তো দাঁড়িয়ে থাকতে পেরেছিলো কণ্ঠনালীতে ঝুলে থাকা মাথা নিয়ে। রক্তে ভেসে গিয়েছিল ঘাস।সেই অপরাধে এই যুবককে গ্রেফতার করা হয় আর বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে এই সদ্য যৌবনে পা দেয়া যুবকটি বলে, আমি নিজের হাতে কুপিয়ে খুন করেছি ঐ সৈনিককে। মৃত্যুদণ্ড আমার প্রাপ্য, তবে আমি যদি বেঁচে যাই তাহলে আরও সৈনিকের কল্লা ফেলে দেবো ঘাড় থেকে। বিচারক মজা পেয়ে বলেছিলো, তাহলে আমি বরং রাজ সৈনিকদের নিরাপত্তার স্বার্থে তোমাকে মৃত্যুদণ্ডই দিই? যুবকটি বিচারকের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলে বলেছিল, আপনি তো খোঁজা!
দ্বিতীয় লোকটার অপরাধ আরও গুরুতর। লোকটার নাম নেফ্রা! লোকটা তার নামের মতো সাইজে ছোট,বামন। নেফ্রা তার গ্রামে বিখ্যাত তার রসবোধের জন্য। তীব্র তীক্ষ্ণ তার রসবোধ। এবং অনর্গল সে কথা বলে যেতে পারে, আদি রস থেকে শুরু করে ধর্মীয় রস সব পাওয়া যায় নেফ্রার কাছে। কেউ কেউ অবসরে শুধুমাত্র নেফ্রার কথা শুনতে আসে। কিন্তু প্রকৃতি তাকে বামন বানিয়ে পাঠিয়েছে। ফলে উঁচু টুলের উপর বসে তাকে গল্প কোরতে হয়। সেদিন নেফ্রা একটা চা দোকানের আড্ডায় বসে সিগারেটের সঙ্গে চা খেতে খেতে বলল, রাণী আন্দ্রার রূপের বর্ণনাই শুধু শুনলাম এতদিন। রাণী আন্দ্রা নাকি রাজা সুরুজের থেকে দুই ইঞ্চি লম্বা! রাজা রাণীর পাশে দাঁড়াবার সময় উঁচু জুতো পরেন! আমি ঠিক করেছি, জীবনে যদি কোনদিনরাণীর দর্শন পাই সেদিন আমি নির্ঘাত একটা মই নিয়ে ওনার কাঁধে ঠেকিয়ে বেয়ে উঠে কানে কানে বলবো, আরেকটু লম্বা হলেই আমি তোমাকে বিয়ে করে নিয়ে যেতাম। আমাদের সন্তান হতো তোমার মতো লম্বা আর আমার চেহারার! কিন্তু তোমার দুর্ভাগ্য যে আমি বামন! কথাটা শুনে সামনে বসে থাকা লোকদের কেউ কেউ বিষম খেলো। কেউ কেউ গলগল করে হাসতে লাগলো। কিন্তু রাজ্যের চারদিকে রাজার ফেউ ঘুরে বেড়ায়। তাদের কাজ জনগণের মধ্যে রাজদ্রোহের কোন ষড়যন্ত্র দেখা মাত্রই নিরাপত্তাবাহিনীর কাছে খবর প্রেরণ। ফলে চা দোকানে থাকা এক টিকটিকি এই কথা শুনে প্রথমে হেসে ফেলে এবং কয়েক সেকেন্ডের ভেতর টের পায় যে, এটা একটা ভুল এবং এটা রাজদ্রোহের সামিল! কেনোনা এই বামন যদি রাণীকে বিয়ে করে তাহলে এই বামনটা তাদের রাজা হয়ে যাবে!! ফলে আগামাথা আর ভাবতে না পারা মোটা মাথার টিকটিকিটা খবর পাঠিয়ে দিলো নিরাপত্তাবাহিনীর কাছে। যেহেতু গ্রামের বামন লোকটি এই কথা বলেছে ফলে খুঁজে পেতে সময় লাগলো না। সন্ধ্যার মধ্যে একদল সৈনিক এলো। তাদের মধ্যে এক নারী সৈনিক নেফ্রাকে চাবুক পেটা কোরতে কোরতে লুটিয়ে ফেললো। ফলে কেউ বুঝতেই পারছিল না নেফ্রার দোষ কি? যখন তারা জানতে পারলো নেফ্রা লম্বা হতে পারলে রাণীকে বিয়ের প্রস্তাব দেবে, এমন রসিকতার দায়ে বন্দি হয়েছে, তখন তারা বুঝতে পারলো, প্রাসাদতন্ত্রেরসব তার ছিঁড়ে জড়িয়েপেঁচিয়ে গেছে। যেদিন বিচারের জন্য নেফ্রাকে কাঠগড়ায় তোলা হল, তখন তাকে খুঁজে পাচ্ছিল না বিচারপতি। যেন ঈশ্বরের মতো অদৃশ্য কোন অপরাধী কথা বলছিল! বিচারপতি নির্দেশ দিলেন নেফ্রাকে একটা টুল দিতে। তারপর তার মুখ দেখা গেলো বিচারকের কক্ষে। নেফ্রা বিচারপতির প্রশ্নের উত্তরে জানায়, চলমান এই বিচারব্যবস্থার অবস্থাও তার মতন, সে বামন হয়ে চাঁদে হাত দেবার আকাঙ্ক্ষায় অপরাধী ফলে বিচারালয় তার সমতুল্য! বিচারপতি বলল, তোমার কথা বুঝতে পারি নি! নেফ্রা বলল, বুঝতে হলে বিচি থাকা লাগে মহামান্য! বিচারপতি বলল, তুমি কি বলতে চাচ্ছ আমার মার্বেল নেই? নেফ্রা বলল, একেবারে ঠিক বলেছ! বিচারপতি ঘেমে গিয়ে বলল, তোমার জন্য মৃত্যুই বিচার! নেফ্রা বলল, মাথা পেতে নিলাম, তবে আপনাদের মতো বড় মানুষেরা মানে, বিচিপতিরাও যে আমাদের মতো বামনদের নিয়েও ভাবছেন সেটা ভেবেই সুখ হচ্ছে! বিচারপতি ক্রুদ্ধ হয়ে হুকুম দিলেন, রাণী এবং বিচারপতি অবমাননার দায়ে নেফ্রাকে দুইবার ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হোক!
তৃতীয় লোকটি একজন শান্ত মাথার অপরাধী! কিছুদিন ধরে রাষ্ট্রে একটা গোপন আন্দোলন শুরু হয়েছে, ‘শব্দে প্রতিবাদ!’ এই আন্দোলনের পদ্ধতিটা হচ্ছে, প্রত্যেকে একটা ছোট্ট চিরকুটে একটা শব্দ বা বাক্য লিখে অন্যকে দেবে বা কোথাও সেঁটে দেবে কিংবা রাস্তায় ফেলে দেবে যাতে অন্য কেউ পেয়ে পড়ে ফেলে দিতে পারে। এই নতুন পদ্ধতির আন্দোলনের ফলে, সমস্ত দেশের রাস্তাঘাটে গাছের বাকলে দেয়ালে চারদিকে টুকরো কাগজের উড়াউড়ি দেখা যেতে লাগলো। সেইসব কাগজে লেখা, ‘রাজা, তোর মুখে আমি মুতি!’ ‘বদল’ ‘পাল্টে দেবো’ ‘বিপ্লব’ ‘ভাঙো’ ‘নৈরাজ্য’ ‘বিচ্ছিন্নতাবাদ’ ‘লড়াই’ এরকম ভয়ানক সব শব্দ,বাক্য।কিন্তু পুলিশ গোয়েন্দারা কেউ খুঁজে বের কোরতে পারে না কে বা কারা এই কাজটা সংঘটিত করছে! ফলে একদিন রাত্রে দেখা যায় এক লোক বড় মাঠের পাশে টর্চ হাতে টুকরো কাগজ সংগ্রহ করছে। শীর্ণ লোকটির কাছে একজন খোঁচর গিয়ে জিজ্ঞাস করে, কি খোঁজ করেন? লোকটা বলে, পত্রিকা তো বন্ধ, আর যে কটা পত্রিকা খোলা আছে তা রাজস্তুতি ছাড়াঅন্য কিছুই লেখে না। তো পড়ার জন্য চিরকুট খুঁজছি! কিছু তো পড়তে হবে? ফলে নির্বোধ খোঁচরটা খবর পাঠিয়ে দেয়। সেই রাত্রে লোকটার বাসায় পুলিশ এসে হাজির হয়, তারা দেখে ঘরের বেড়ার গায়ে গুঁজে রাখা একটা কাগজে লেখা,
‘যন্ত্র তুমি জানো না যন্ত্রণা, মানুষ কেন ভাঙে, ভেঙে ফেলতে চায়!’
ফলে তারা সবাই হাসি হাসি মুখে বলে, তাইলে এই ষড়যন্ত্রের একজনকে পাওয়া গেলো? ফলে তারা তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায় এবং তার ঘরের সবকিছু পুড়িয়ে দেয়। বিচারের সময় বিচারপতি তার দিকে বলে, আপনারা এইসব উদ্ভট আন্দোলনের পদ্ধতি খুঁজে পান কোথায়? উত্তরে তিনি বলেন, বাজারে কিনতে পাওয়ার কথা না, যেহেতু বাজারটা আপনারাই নিয়ন্ত্রণ করেন। আমরা খুঁজে পাই কারণ আপনারাই মূলত জন্ম দিচ্ছেন এইসব পরিস্থিতি! ফলে বিচারক বলে, প্যাঁচাপেঁচির করে লাভ নেই। আপনাকে বাঁচিয়ে রাখা যাবে না। আপনি ভয়ংকর মানুষ! লোকটা বলে, ধন্যবাদ আমার স্ত্রী শুনলে খুশি হতেন। ফলে বিচারকের কক্ষে হাসির গমক ওঠে।
আচমকা জোড়া শিঙা বেজে ওঠে। চারদিকে নীরবতা নামে। শুরু হয় শান্তি সঙ্গীতের সুর। বাতাসে ছড়িয়ে দেয়া হয় লোবানের ঘ্রাণ। আর কফিনের নীরবতা নামে যেন চারদিকে। লোকেরা জানে এই পরিস্থিতির মানে, মঞ্চে রাজ পুরোহিত, রাণী এবং রাজা দৃশ্যমান হবেন কিছুক্ষণের মধ্যে। একজন কেউ ভিড়ের মধ্যে বলল, এই তপ্ত রোদের মধ্যে শান্তি-সুর নামের এই মরা সুর বিরক্তিকর লাগছে। অন্য কেউ বলল, ধুর বাল শেষ হবে কখন? ঘাড়ে ধরে এনে উৎসব হয় নাকি? আবার কেউ বলল, হিসসস! টিকটিকি শুনলে এখানেই গায়েব হয়ে যাবে। কেউ একজন বলল, টিকটিকির গুষ্টিমারি। ফলে অন্য কেউ বলল, রাজা যদি মঞ্চে উঠতে গিয়েও হড়কে পড়ে গিয়ে মরত! কে যেন বলল, ভালো বলেছো! তোপ দাগানো হল সাতবার! মঞ্চে দৃশ্যমান হলেন রাজ পুরোহিত! জুবুথুবু বৃদ্ধ! তাকে ধরে এনেছেন রাণী। কেনোনা রাজ পুরোহিত অন্ধ! এই রাজ্যের নিয়মই এই, যিনি আচার্য পুরোহিত হবেন তিনি হবেন অন্ধ। তার চোখ উপড়ে দুটো পাথরের চোখ বসিয়ে দেয়া হবে। এ জন্য একটা প্রকল্প চালনা করা হয় রাজ অনুগ্রহে। যেহেতু এখানে ধর্মই রাজ শক্তির মূল সেহেতু মেধাবী ধর্ম-শিক্ষার্থীদের বিশেষ বৃত্তির ব্যবস্থা আছে। যৌবনে তারা এই বৃত্তি পেয়ে থাকে। তারপর আনুগত্যের নানান শিক্ষার সিঁড়ি টপকে, একটা বয়সে গিয়ে তাদের জন্য তৈরী হয় একটা ‘বিশেষ’ সুযোগের সেটা হচ্ছে এই ‘রাজ পুরোহিত’ হবার সুযোগ। জুবুথুবু রাজ পুরোহিতদের বিরাট এক প্যানেল আছে তারাই মিটিং করে সকল বিষয়ে ধর্মীয় ব্যাখ্যা দাঁড়া করান। কিন্তু রাজ পুরোহিত হবার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে চূড়ান্ত শর্ত একটাই,চোখদান কোরতে হবে রাজাকে। বিনিময়ে রাজার পক্ষ থেকে তাকে দেয়া হয় দুটো পাথরের চোখ। কেনোনা রাজ পরিবার বিশ্বাস করেন, আচার্য রাজ পুরোহিতেরা জাগতিক ক্লেদ, অপরাধ, পাপ কিংবা সকল লেনদেন দর্শন থেকে বিরত থাকবেন। তারা তাই শুনবেন যা তাদেরকে শোনানো হবে, তারা তাই জানবেন তাদের যা জানানো হবে, তাদের চিন্তা হবে রাজা যা চিন্তা কোরতে শেখাবেন। এই অন্ধ পুরোহিতেরা রাজ্যের সকল গ্রামেনিয়োজিত থাকেন, এদের মধ্যে থেকে বিভিন্ন পরীক্ষা এবং দক্ষতার উচ্চতায় নির্বাচিত হয়, আচার্য! এই আচার্য পুরোহিতেরা রাণীর অনুগ্রহে থাকেন, রাণী নিজেই তাঁদেরকে তদারকি করেন। কেনোনা এরকমও উদাহরণ আছে, এক যুগ আগে এক যুবক তার ধর্মতাত্ত্বিক এক লেখায় লিখেছিল, ‘রাজ পুরোহিতেরা রাজাকে ঈশ্বরের ছায়া বলেন, কিন্তু রাজা চিন্তা করেন পুরোহিতের মাথা দিয়ে! আমি বলি, চিন্তা আমার ঈশ্বর!’ ফলে সেই যুবককে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে রাখা হয় তার গ্রামের সাতরাস্তার মোড়ে। সেই লাশ ঝুলন্ত অবস্থাতেই পচতে থাকে। তার জন্য কবরের বরাদ্দ দেয়া হয় না।
ঘণ্টাধ্বনি বেজে ওঠে। সবাই নীরব হয়। আচার্য পুরোহিত বক্তৃতার মঞ্চে দণ্ডায়মান হন। তাঁর শুভ্র শীর্ণ বিষণ্ণ আভার মুখ থেকে শব্দ বের হয় জড়িয়ে জড়িয়ে। তিনি বলেন, আমি ভাগ্যবান আমার বয়স আমাকে এখনো জীবিত রেখেছে আপনাদের সঙ্গে আরেকটি রান্তাই উৎসব উৎযাপনের জন্য। আমি বিনীত মহা শক্তির কাছে। আমি স্বীকার করি মহাশক্তির ছায়ার ভাগীদার আমাদের মহামান্য সম্রাট। তাঁর স্ত্রীর শুশ্রূষা আমার আয়ুকে নিরাপদ রেখেছে। আমি আপনাদের উপদেশ দেবার জন্য আসতে পেরে প্রীত! হে আমার সন্তানেরা, তোমরা তোমাদের চিত্তে রাজভক্তিকে করো সর্বপ্রথম, কেনোনা জনক জননীরা তো কেবল জন্মই দেয় আর রাজা করেন প্রতিপালন;যেহেতু তিনি ভূমি দান করেন এবং তোমাদের উৎপাদিত সকল শস্যদানাই তাঁর শস্যভাণ্ডারের জন্য, এবং তোমাদের দৃশ্যত প্রতিপালক পিতামাতারাও কিন্তু রাজার মুখাপেক্ষী। তাই তোমরা নত হও ততোটাই যতোটা তোমরা মহাক্ষমতার মুখোমুখি হলে হতে! রাজা তো মহাশক্তির ছায়া। দৃশ্যতরূপ! হে আমার সন্তানেরা জেনে রাখো, রাজার সকল সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত এবং হিতকারী! সকল চুক্তি মান্য করা তোমাদের জন্য আবশ্যক! রাজাকে প্রশ্ন করা নিজের আত্মাকে বিভ্রান্ত করার সামিল! আমি জানি তোমাদের একটা দল প্রশ্ন কোরতে ভালোবাসে, কিন্তু তোমাদের সেই দলের লোকেরা এটাও জানে যে, প্রশ্ন সকল দিক থেকেই করা যায়! ফলে যেই প্রশ্ন তারা করে থাকে তারা কি জানে না যে সেই প্রশ্নেরও আছে বিরোধী প্রশ্নসমূহ? তবু তারা প্রশ্ন কোরে অন্যকে নয় আসলে নিজেকেই বিপদগামী করে। পথ তো অনেক আছে, প্রকৃত পথের সন্ধান থেকে যারা সরে যায় তাদের চিত্ত চিরকাল নির্বাসিত থাকবে। আমি তোমাদের তাই রাজানুগত্যে নিবেদিত থাকবার জন্য আহ্বান করি। যেন তোমরা বিচ্যুত না হও। আর রাজপেয়াদার চাবুকের প্রতিটা আঘাততোমাদের পার্থিব ক্লেদের পুরস্কার। তোমরা মনে করো সেই চাবুক তোমাদের ত্রুটি মুক্ত করার জন্য সচেতন রাখে! রাজপেয়াদার প্রতিটা আঘাত মুখ বুজে সহ্য করাই শ্রেয়! যারা চিৎকার করে তারা প্রকৃতই নিজের ক্ষতিসাধন করে এটা প্রমাণিত! কেনোনা তোমার সকল কিছুই রাজার, আর রাজার সকল সিদ্ধান্তে তুমি মাথা নত কোরতে বাধ্য। তুমি রাজার জন্য নিজেকে রেখেছ নিবেদিত, রাজার কিছুই তোমার না কেনোনা রাজা তোমার সমুতুল্য নয়, কেনোনা রাজা কেবল গ্রহণ করেন। তিনি ঋণ গ্রহণের মাধ্যমে তোমাকে তা দান করেন এবং সেই ঋণ পরিশোধে তুমিই বাধ্য! কারণ তোমার ভূমির মালিক রাজা! রাজা হচ্ছেন জোঁক আর তুমি হচ্ছো শরীর…তোমার জীবন্ত শরীর এক মহাপরীক্ষার মধ্যে নিমজ্জিত! মৃত্যুই কেবল তোমাকে মুক্তি দেবে রাজার নিগ্রহ থেকে…তাই বিদ্রোহ করো যদি মৃত্যুকে গ্রহণ করার সাহস থাকে, তোমরা কি জানো না তোমাদের পূর্ববর্তী বিদ্রোহীদের করুণ পরিণতি?
ভাষণ এই পর্যন্ত আসার পর রাণী আন্দ্রা তার রূপের বেসাতি নিয়ে দ্রুতপায়ে এগিয়ে আসেন। আচার্যধর্মতাত্ত্বিককে আলতো করে টেনে নামিয়ে নিয়ে যান তিনি। মন্ত্রীদের কেউ কেউ ব্যাপারটা বুঝতে পারে। রাজ পরিবারের কেউ কেউ খুশি হয়। কেনোনা তারা জানে অন্ধ আচার্য পুরোহিত কোন পথে কি বলে দিয়েছে! ফলে জনগণের মধ্যে থেকে একটা ক্ষীণ কণ্ঠস্বর জেগে উঠলো যে, তারা আচার্যের ভাষণ শুনতে চায়। কিন্তু সেই কণ্ঠধ্বনি দীর্ঘস্থায়ী হয় না, বিদুষী রাণী ব্যস্ত হয়ে এগিয়ে এসে ঘোষণা করেন, আচার্যের আচমকা অসুস্থতার জন্য তিনিঅপারগ আর কোন শব্দ উচ্চারণ করতে! ফলে রাণী নিজেই আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দিয়ে দেন, আচার্য পুরোহিতের অসুস্থতায় রাজা ভীষণ চিন্তিত তাই তিনি তাঁর চিকিৎসার জন্য সঙ্গে যাচ্ছেন! ফলে এ বৎসরের উৎসবে রাজার ভাষণ হবে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে। এবং এর সাথে সাথেই তিনি এই উৎসবের সূচনা ঘোষণা করেন। ফলে চারদিকে এক সূক্ষ্ম অস্থিরতা শুরু হয়ে যায়। কেউই কিছু বুঝে উঠতে পারে না। আসলে কি এমন হয়েছে? বিনোদনমন্ত্রী মঞ্চে এসে অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্ব শুরু করার ইশারা দেন এবং সঙ্গে সঙ্গে একদল কোরাস শিল্পী গলাচেরা চিৎকার দিয়ে বিষণ্ণ এক সঙ্গীতের পরিবেশনা শুরু করে ব্যাপারটার মোড় ঘুরিয়ে দেয়!
সঙ্গীত শেষে করতালির সাথে তেরোবার তোপধ্বনি হয়! তেরো হচ্ছে এই রাজ পরিবারের স্থপতি রাজার জন্ম তারিখ!
প্রচ্ছদঃ সুমন মুখার্জী