নির্বাক সময়ের গল্প – রোমেল রহমান


যা হয়ে গেছে


যা হয়ে গেছে

(ঝ)

বিচিত্র মত

বিচিত্র পথ

বিচিত্র বিশ্বাস

সব কটাকে ধরেবেঁধে

খাওয়াও মাঠের ঘাস,

একই রঙের

একই ঢঙয়ের

চাই সকলের মাপ,

আর কেউ নয় আমিই রাজা

আমিই সবার বাপ!

মুর্গি মন্ত্রীকে ডাকলেন রাষ্ট্রপ্রধান। তার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে তাদের আলাপ ছিল এরকম-

রাষ্ট্রপ্রধানঃ তোমাকে আমি বিশেষভাবে পছন্দ করি বলে মুর্গিমন্ত্রী পদ সৃষ্টি করে তোমাকে বসিয়েছি! আশা করছি কাজে সেটার প্রমাণ দেবে!

মুর্গিমন্ত্রীঃ আপনি চিন্তা করবেন না…ধারাবাহিক প্রকল্প নেয়া হয়েছে, যার চমক শেষ কোরতে করতেই কয়েক যুগ কেটে যাবে! যেমন, অন্যতম একটি প্রকল্প হচ্ছে; এক জাতের শান্ত মুর্গির সঙ্গে আপোষকামী স্বভাবের বিশেষ প্রজাতির মুর্গির মিশ্রণ ঘটিয়ে নতুন এক প্রজাতি তৈরীতে আমরা মনোযোগী হয়েছি…!

রাষ্ট্রপ্রধানঃ [মুর্গির পালক দিয়ে কান চুলকোতে চুলকোতে!] বাহ! শান্তি পেলাম! কিন্তু কামান মন্ত্রী সেদিন বলছিল অভ্যুত্থান বিষয়ক কিছু কানাঘুষা নাকি শোনা যাচ্ছে?

মুর্গিমন্ত্রীঃ অতো চিন্তার কি আছে মহামান্য? বেশি ঝামেলা দেখলে, ঘেটি ধরে কামানের সামনে বেঁধে উড়িয়ে দিলেই হল!

রাষ্ট্রপ্রধানঃ তুমি দেখি কামান মন্ত্রীর মতো কথাবার্তা বলছ?

মুর্গিমন্ত্রীঃ দুঃখিত মহাত্মা! উত্তেজনায় এইসব হয়েছে! আসলে আমার বলা উচিৎ ছিল ধরে ধরে বিদ্রোহী গুলোকে মুর্গি বানিয়ে দিলেই হল…!

রাষ্ট্রপ্রধানঃ হুম্মম! ভাষা বিষয়ে সচেতন থাকা চাই! যাইহোক, প্রত্যেক শহরের প্রাণকেন্দ্রে মুর্গির ভাস্কর্য তৈরি কদ্দূর…?

মুর্গিমন্ত্রীঃ [আহত মুখে বলল] ভাস্করদের কাছে থেকে ডিজাইন আহ্বান করা হয়েছিলো! মোটামুটি সাড়া পাওয়া গেছে! কাজ শুরু হয়ে গেছে! ঝড়ের গতিতে কাজ আগাচ্ছে!

রাষ্ট্রপ্রধানঃ ওভাবে মুখ কালো করে বলছ কেন?

মুর্গিমন্ত্রীঃ না এক তরুণ ভাস্কর একটা ডিজাইন জমা দিয়েছে সেটা নিয়ে সামান্য সমস্যা!

রাষ্ট্রপ্রধানঃ [চোখ সরু করে] কি সমস্যা বল দেখি?

মুর্গিমন্ত্রীঃ না সে একটা প্রকাণ্ড মোরগ বানিয়ে তার পিঠে আপনাকে বসিয়ে দিয়েছে… এবং মোরগটার পিছনে একদলা গু! পায়খানাটুকু দেখতে আমার মতো!

এই কথা শুনে রাষ্ট্রপ্রধান পেটফাটা হাসি হাসতে হাসতে আচমকা চেয়ার থেকে হড়কে পড়ে গেলেন মেঝেতে। এবং গুরুতর আহত হলেন। মুর্গিমন্ত্রী চিন্তিত হয়ে পাথর হয়ে থাকলেন। মুহূর্তের ভেতর কি থেকে কি হয়ে গেলো। তিনি রাষ্ট্রপ্রধানকে মেঝে থেকে তুলে ওঠাবার শক্তি খুঁজে পেলেন না আর লহমায় পর্দার অন্তরাল থেকে রাষ্ট্রপ্রধানের বিশেষ নিরাপত্তাকর্মীরা বেরিয়ে এসেই প্রথমে মুর্গিমন্ত্রীকে বন্দুকের কুঁদোর আঘাতে শুইয়ে ফেলল। তারপর রাষ্ট্রপ্রধানকে একদল নিয়ে গেলো আর কয়েকজন পিঠমোড়া করে তুলে নিয়ে গেলো মুর্গিমন্ত্রীকে। প্রায় অচেতন মুর্গিমন্ত্রীর হঠাৎ মনে হল, ভাগ্য তার সঙ্গে নেই, নইলে এমন দুর্ভাগা কেউ হয়? কেনোনা, মুর্গিমন্ত্রী একসময় ছিলেন রাষ্ট্রপ্রধানের মুরগিওয়ালা। তখন অবশ্য আজকের রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন পাড়া মহল্লার নেতা, এবং তিনি এই লোকের কাছ থেকে মুর্গি কিনে থাকতেন নগদে বা বাকিতে, ফলে তাদের মধ্যে ছিল এক ধরনের  গভীর হৃদ্যতা। যে কারণে যখন তিনি সরকারের মুকুট হলেন তখন তিনি ঐ মুরগিওয়ালাকে মুর্গি বিষয়ক মন্ত্রী বানিয়ে দিলেন! এবং দুনিয়াকে জানিয়ে দিলেন রাষ্ট্রপ্রধান চাইলে কি না কোরতে পারে! ফলে যেদিন মুর্গিওয়ালা মন্ত্রী হয়ে গেলেন সেদিনই তার ঈশ্বরের প্রতি সন্দেহ হয় যে, তার মতো একজন সাধারণ মুর্গিওয়ালার ভাগ্যে মন্ত্রীত্ব কি কোন ভুল সিদ্ধান্তের ফল? আজ সেটা টের পেলেন মুর্গিমন্ত্রী, যখন তিনি বন্দুকের কুঁদোর আঘাতে প্রায় অচেতন হয়ে সৈনিকদের কাঁধে চড়ে চালান হয়ে যাচ্ছেন। এবং তাঁর এইসব জিনিস মাথায় আসে এবং কল্পনায় তিনি দেখতে পান একটু পর তার উপর গোয়েন্দা বাহিনীর শুরু হতে যাওয়া নির্মম নির্যাতন, কেনোনা রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যার ষড়যন্ত্র তদন্তের কাজ শুরু হবে এবং ভাগ্য তাকে ফাঁসিয়ে দিয়েছে সেই ফাঁদে। ফলে কিছুক্ষণের মধ্যে রাষ্ট্রপ্রধান ভবনের ছিদ্র গলে এই খবর বাইরে চলে যায় যে, আচমকা হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে রাষ্ট্রপ্রধান মারা গেছেন! ফলে কেউ কেউ বলে, উনার মুর্গির প্রাণ ফুট করে নিভে গেলো!? ফলে সেনা ব্যারাকে অন্য উত্তেজনা উৎপন্ন হল, কোনো কোনো বিদ্রোহী সেনা অফিসার তার সৈনিকদের নিয়ে বিদ্রোহের জন্য খুঁটিতে বাঁধা ষাঁড়ের মতো ফোঁস ফোঁস কোরতে লাগলো। ফলে কে আগে দড়ি ছিঁড়ে বেরোবে এই ঠেলাঠেলিতে সময় যেতে লাগলো! এর মধ্যে মুর্গিমন্ত্রীকে রিমান্ডে নিয়ে বিশেষ গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান বলল, কি আজিব ভাগ্য দেখো, মুর্গি মন্ত্রীর পায়ুপথে মুর্গির ডিম দেয়া হবে আজ! সব অফিসাররা খিলখিল করে হাসতে লাগলো! তখন একজন অফিসার বলল, স্যার দুইটা রাজহাঁসের ডিম আনছিলাম। হাঁসের ডিম সাইজে বড়! আগে হাঁস দিয়া ট্রাই নি? এই কথা শুনে মুর্গিমন্ত্রী অচেতন হয়ে যান! কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যে খবর আসে, রাষ্ট্রপ্রধান মারা যান নি, বরং তিনি হড়কে পড়ে যাওয়ায়, তার সামনের দুটো দাঁত ভেঙে গেছে। দন্ত বিয়োগের ব্যথায় রাষ্ট্রপ্রধান ভীষণ কাতর! তবে তিনি দেশবাসীকে জানিয়েছেন, বিভ্রান্ত হবেন না, আমি বেঁচে আছি আপনাদের পাশেই আছি! তার দাঁতভাঙা ছবি সহ সেই সংবাদ নিশ্চয়ই নান্দনিক! এবং সেই ছবি ভাইরাল হতে বাধ্য! ফলে গোয়েন্দা বিভাগের একজন বলল, স্যর রাষ্ট্রপ্রধান তো জিন্দা! এই মুর্গিওয়ালা মালটারে কি করবো? এই শালা তো অজ্ঞান হয়ে গেছে আতঙ্কে! গোয়েন্দা প্রধান বলল, এইরকম চান্স আর পাবা না! হাঁসের ডিম ঢুকায় দেও একটা! সেদ্ধ করছ তো? গরম গরম ঢুকায় দেও দেখবা বাবাজির জ্ঞান ফিরা আসবে! একজন কে বলল, একটু ভেসলিন মাখায় নিও! ফলে গ্লাভস পরা হাতে একজন কেউ মুর্গি মন্ত্রীর পায়ুপথের দিকে যখন একটি উষ্ণ হাঁসের ডিম পুরে দেয়, তার মুহূর্তের ভেতর একটি চিৎকার বাতাস কাঁপিয়ে দেয়। ফলে গোয়েন্দারা বলে, এই তো মন্ত্রী স্যারের জ্ঞান ফিরেছে। মুর্গিমন্ত্রী তাদের দিকে তাকিয়ে বলে, আমি মাফ চাই আমি মন্ত্রীত্ব করবো না! আর তখন পুচুৎ করে তার পিছন থেকে বেরিয়ে আসে একটি থেঁতলে যাওয়া হাঁসের ডিম! একজন কেউ বলে, মন্ত্রী স্যার ডিম পাড়ছেন!

সেদিন বিকালে একদঙ্গল দুষ্টু বালকবালিকা গুলতি দিয়ে গ্র্যান্ড স্কয়ারে রাষ্ট্রপ্রধানের  যে বিরাট ভাস্কর্য আছে সেটার হাস্যজ্বল মুখ থেকে দুটো দাঁত ফেলে দিয়ে প্রমাণ করে, বিদ্রোহ জ্যান্ত আছে শিরায় শিরায়। সেদিন সন্ধ্যায়  সেনা ব্যারাকে এক তীব্র বিপন্নতার চিৎকার ক্রমাগত উঠতে থাকলো। সকালবেলা বিদ্রোহের জন্য কুঁদাকুঁদি কোরতে থাকা অফিসারদের ধরে ধরে ফায়ারিং স্কোয়াডে হত্যা করা হচ্ছে।  তাদের বাঁচার জন্য আর্তি আর পরিবারের কান্না সেনা এলাকার কাঁটাতারে আঁটকে থাকে।  শুধুমাত্র সুয়ারেজ লাইন বেয়ে তাদের রক্ত বেরিয়ে যায় নদীর জলে। আর রাত্রে সকল প্রচার মাধ্যমে জানানো হয়, দন্তচিকিৎসা জনিত কারণে রাষ্ট্রপ্রধান আপাতত টিভি পর্দায় আসবেন না এবং তার কোন ছবি আপাতত কয়েকদিন প্রকাশিত হবে না। এবং রাষ্ট্রপ্রধান জাতির কাছে নিবেদন করেছেন, এই আপৎকালে কেউ যেন বিভ্রান্ত না হন! ফলে সেদিন রাত্রে কয়েকজন উৎসাহী আমলা তাদের দুটো করে দাঁত ভেঙে ফেলে রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে সমব্যথী হন! পরেরদিন হিড়িক পড়ে যায় দাঁত ফেলে দেবার। এর পরেরদিন প্রজ্ঞাপন জারি হয় রাষ্ট্রপ্রধানের ব্যথায় সমব্যথী হবার জন্য যে কেউ চাইলেই দাঁত ফেলতে পারেন, তার জন্য কোন দন্ত চিকিৎসকে ফি দিতে হবে না, সকল চিকিৎসক এই দাঁত ফেলতে বাধ্য! ফলে আমজনগণের মধ্যে কেউ গেলো কিনা জানা যায় না, তবে মন্ত্রী আমলাদের অনেকেই দাঁত ফেলে দিলো। এবং মন্ত্রীপরিষদ বিরাট দাঁতের ব্যথায় কাতর হয়ে থাকলো। যেদিন রাষ্ট্রপ্রধান সোনা দিয়ে বাঁধানো দুটো দাঁত সহ হাস্যজ্বল মুখে ক্যামেরায় এলো, সেদি সবাই মনে মনে আফসোস কোরতে লাগলো, ফলে এবার সকলে রাষ্ট্রপ্রধানের মতো দাঁত বাঁধাতে ব্যস্ত হল।  কিন্তু রাষ্ট্রপ্রধান ফিরে আসলেও একটা জটিলতা থেকে গেলো।  কারা যেন ছড়িয়ে দিলো, এই রাষ্ট্রপ্রধান সেই রাষ্ট্রপ্রধান না! ফলে এই কথা বেশ চাউর হল, এবং এক পর্যায়ে মন্ত্রী আমলাদেরও কারো কারো সন্দেহ হতে লাগলো, ইনি কি সেই রাষ্ট্রপ্রধান নাকি তার ডামি? ফলে সন্দেহ যখন মুখেমুখে ছড়িয়ে গেলো, তখন সরকারী টিভি সহ সমস্ত প্রচার মাধ্যমে এবং রাস্তায় রাস্তায় বিলবোর্ডে টাঙানো হল, বর্তমান রাষ্ট্রপ্রধানের সোনালী দাঁতের হাস্যজ্বল ছবির সঙ্গে আগের সাদা দাঁতের হাস্যজ্বল ছবি পাশাপাশি, যার ক্যাপশন দেয় হল, 

‘আসল এবং খাঁটি রাষ্ট্রপ্রধান, তফাৎ শুধু সোনায়! গুজবে কান দেবেন না!’

ফলে রাস্তায় রাস্তায় পুলিশের সংখ্যা বাড়ল। আর খোঁজ করা হতে লাগলো এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে কে জড়িত? ফলে গোয়েন্দা বিভাগের একজন অফিসার তার সিনিয়রকে ফিসফিস করে জিজ্ঞাস করলো, স্যার আমরা আসলে কি জন্য কাকে সন্দেহ করছি? রাষ্ট্রপ্রধান তো মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিলেন এটা ভিডিও ফুটেজেও দেখা যাচ্ছে। সিনিয়র গোয়েন্দা বলল, কাউকে খুঁজছি না খুঁজতে খুঁজতে একটা সন্দেহজনক ক্যারেক্টার দাঁড় করাচ্ছি যাকে দেখা যাচ্ছে না আপাতত তবে প্রয়োজন মতো তাকে টেনে বের করে আনা যাবে! এই সমাজে ভীতিটা দরকার! জুনিয়র গোয়েন্দা হতাশ মুখে তাকিয়ে থাকলো। সিনিয়র বলল, চাকুরি কোরতে এলে চিন্তা কেটে বাদ দিয়ে আসতে হয়! ফলে সারাদেশে তল্লাশি আর বিশিষ্ট কয়েকজন বুদ্ধিজীবীর দিকে আঙুল তোলা হল রাষ্ট্রপ্রধান হত্যার এই ষড়যন্ত্রের জন্য! ফলে গোপনে আবার দেশ ত্যাগ শুরু হল।

আর গ্র্যান্ড স্কয়ারের ভাস্কর্যের ভাঙা দাঁতের যায়গায় সোনার দাঁত লাগিয়ে দেয়া হল। অর্থমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় মুদ্রায় হাস্যজ্বল রাষ্ট্রপ্রধানের পুরাতন ছবি বদলে তার সোনালি দাঁতযুক্ত হাস্যজ্বল ছবি যুক্ত করে নতুন টাকা ছাপতে হুকুম দিলেন।

(ঞ)

কোথায় যাবে?

চিন্তা তোমার সঙ্গে যাবে,

জলের উপর তোমারই মুখ।

পালিয়ে কোথাও শান্তি পাবে না।

চিন্তা তোমায় চিন্তিত কোরবেই!

পলাতকের বড় গলায় হাঁক দেয়া সাজে না।

তুমি থাকো তোমার ভাষার, যদি লড়াই কোরতে চাও।

 

তাদের দিকে তাকিয়ে কবি বললেন, আপনাদের দেরি হয়ে যাচ্ছে বোধহয়। আপনারা বেরিয়ে যেতে পারেন যদি যেতে চান। একজন বলল, কিন্তু আপনাকে ফেলে যাবো? তিনি তার দিকে বিরক্তি নিয়ে বলেন, পলাতক মানুষের সঙ্গে আমি পালাতে যাবো কোন দুঃখে? দলের সিনিয়র বুদ্ধিজীবী ব্যাপারটা বুঝতে পারলেন। তিনি চোখের ইশারায় নধর বুদ্ধিজীবীকে থামিয়ে দিয়ে কবির দিকে তাকিয়ে বললেন, না না আসলে ও আপনার অবস্থান বুঝতে পারে নি। আসলে আপনি জল দিয়ে আশ্রয় দিয়ে জীবন্ত করেছেন আমাদের তাই আপনার সঙ্গ চাচ্ছিল হয়তো! কবি বললেন,  কিন্তু আপনারা যাচ্ছেন কোথায়? ও না হয় বয়সে অল্প কিন্তু আপনি তো চুল পাকা লোক! এই প্রশ্নে সিনিয়র বুদ্ধিজীবী চাপ খেয়ে গেলেন এবং মিনমিন করে বলল, আসলে আমরা যাচ্ছি প্রশ্নদ্বীপে! ফলে কবি একটা মুচকি হাসি দিয়ে একটা কঠিন স্বরের প্রশ্ন করলেন, সেখানে কোন দুঃখে? সেখানে গিয়ে তুমুল আকাশস্পর্শী চিন্তার খামার করবেন? ফাটিয়ে দেবেন লিখে? ফলে সবাই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায় এই পাল্টা প্রশ্নে। তরুণী বুদ্ধিজীবীটি বলে, খুন হলে, বন্দি হলে কি চিন্তার সুযোগ থাকবে? দেশে যখন কথা বলারই উপায় নেই, প্রতিবাদ করারই সুযোগ নেই তখন কি হাঁড়িকাঠে গলা পেতে বসে থাকাটা বুদ্ধিমানের কাজ? কবি বললেন, প্রতিবাদের নতুন নতুন ভাষা তৈরি করো, দুয়ার বন্ধ থাকলে সিঁধ কাটো! দল ধরে পালিয়ে গিয়ে পাহাড় চূড়ায় উঠে পাথর নিক্ষেপ করে সমতলের শত্রুকে ঘায়েল করা যায় না, সেই পাথর সাধারণ মানুষদের গায়েও পড়ে। তোমরা প্রশ্নদ্বীপে যেতে চাচ্ছো কীজন্যে? সেখানে শৃঙ্খল বা নিয়মকানুনের বালাই নেই, বিচিত্র জীবন ব্যবস্থা আছে, গার্হস্থ্যের টানাটানি নেই, ইচ্ছে মতন থাকা যায়, বাঁধনছেঁড়ার বাধ্যবাধকতা নেই, এইসব প্রলোভনে নয় তো? শেষতক নিজের আরাম আয়েসের জন্যে কি? আর সেখানে যে একটা বিশেষ ভাষার আধিপত্য আছে সেটা কি জানা আছে? নাকি তর্জমা পড়তে পড়তে নিজেকে ঐ ভাষার কেউ ভেবে বসে আছো? শেষতক তুমি তোমার ভাষার প্রতিনিধি! আর ঐ দ্বীপ চলে কি করে? খরচ আসে কোথা থেকে? যারা অনুদান দিয়ে অমন একটা চমৎকার চিড়িয়াখানা বানিয়ে রেখেছে সেখানে তাদের নিজস্ব কিছু এজেন্ডা আছে যেটা একটু চোখ খুললেই দেখা যায়। তুমি কি শেষমেষ তোমার নিজের চিন্তার লাইন ফেলে ওদের এজেন্ডাকে আধুনিক মনে করে কামলা হতে যাচ্ছ? এক যুবক কবি বিস্ময় নিয়ে বলল, দারুণ! এভাবে ভাবি নি! আমি যাচ্ছি না! আমি যাবো না, থেকে যাবো! কিন্তু আপনি এই গণ্ডগ্রামে বসে প্রশ্নদীপের এতো খোঁজ জানেন কি করে? কবি বললেন, গাধার কান লম্বা বলে যে সে একাই সব শুনতে পায় তা নয়,কুকুরের ঘ্রাণ শক্তি তুখোড় সেও অনেক কিছু জানে যা গাধা জানে না!

ফলে দুটো দল হয়ে গেলো বুদ্ধিজীবীদের। একদল প্রশ্নদ্বীপে যাবে আরেকদল যাবে না। আবার যারা যাবে না তারা শহরে ফিরে যাবে নাকি এইখানে থাকবে তা নিয়ে বিভ্রান্ত। একজন বলল, এখান থেকে শহরে ফেরার রাস্তা কি ঐ একটাই? কবি বলল, কেন আবার ফেরার পথে ওইসব হ্যাপা পোহাতে ভয় হচ্ছে? গায়ক বলল, আপনি কি করে জানেন আমরা ওইসবের মধ্যে দিয়ে এসেছি? আর ওগুলো কি বাস্তব? কবি বলল, বাস্তবতা আসলে কি? আমি কি আছি নাকি ছিলাম? যা দেখছ তা আপাতত পরিমাপ। পরিমাপক ভিন্ন হলে মাপ ভিন্ন হয়ে যাবে। বাস্তবতার সংজ্ঞা বদলে যাবে! সিনিয়র বুদ্ধিজীবী বলল, আপনি কে? চারদিকে নীরবতা নেমে এলো!

একদল বুদ্ধিজীবী উত্তরের অপেক্ষা না করেই বলল, আমরা বিভ্রান্ত হচ্ছি এই মানুষটার কথায়।  আমরা প্রশ্নদ্বীপের দিকে যাত্রা শুরু করছি, যারা সঙ্গে যেতে চাও এসো! ফলে একটা বড় অংশ বেরিয়ে যায়। আর থেকে যায় হাতে গোনা কয়েকজন। তারা হয়তো বাড়ি ফেরার রাস্তায় পা বাড়ায়।

 

প্রচ্ছদঃ সুমন মুখার্জী


যা হতে চলেছে


যা হতে চলেছে