(ট)
রক্ত মেখে দুহাতে আজ তৈরী করছ সুখ?
নিজেই নিজের মুর্দাফরাশ তুমি!
লড়তে যদি পারো তবে বিজয় সুনিশ্চিত!
আকাশ ভরা মেঘ,
পায়ের নিচে ভূমি;
বীজ ছড়ানো জারি রাখো,
বৃষ্টি পড়লে সবুজ হবে খুব।
রাষ্ট্রপ্রধান অভ্যাসবশত মুর্গির পালক দিয়ে কান চুলকাচ্ছিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে তাঁকে বের হতে হবে। সমগ্র দেশে আজ একযোগে ১০১ টি মুর্গির ভাস্কর্য উদ্বোধন হবে। তিনি করবেন একটি বিশেষ ভাস্কর্য উদ্বোধন। যেটি রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে স্থাপন করা হচ্ছে। আর সেটির উদ্বোধনের সঙ্গে সঙ্গে সমগ্র দেশের অন্য সব ভাস্কর্যের পর্দা উন্মোচিত হবে। ফলে সারা দেশে আজ উৎসবের আমেজ। সরকারী কর্মকর্তারা আজ ভীষণ ব্যস্ত। তারা সেই ভোর থেকে দৌড়ের উপর আছে। স্কুলের বাচ্চাদের আনা হয়েছে। তাদের হাতে মুর্গির ছাপ্পা মারা ফ্লাগ! অনুষ্ঠানের একটা পর্যায়ে স্কুলের বাচ্চাদের হাতে দুটো করে বিশেষ প্রজাতির মুর্গির বাচ্চা দেয়া হবে। রাষ্ট্রপ্রধানের ১০১টি ভাস্কর্যের মধ্যে বেশ কয়েকটি কাজ বিশেষভাবে নজর কেড়েছে, একটা কাজ আছে এরকম যে, একটা অতিকায় মুর্গি দৌড়ে যাচ্ছে আর তার পিঠের উপর রাষ্ট্রপ্রধানবসা রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে বিস্ময়কর লাগলো যখন তিনি কল্পনায় দেখলেন নিজেকে, এবং তিনি মুর্গির লাগাম ধরে আছেন। তিনি ভাস্করকে ডাকালেন এবং জিজ্ঞাস করলেন, আইডিয়াটা বুঝায় বলো! ভাস্কর গদগদ হয়ে বলল, মহামান্য আপনি কি লক্ষ করেছেন আমার ভাস্কর্যটির নাম ঊর্ধ্বশ্বাস! এর মানে দেশের উন্নয়ন যে ঊর্ধ্বশ্বাসে আগাচ্ছে এবং তা যে আপনিই চালাচ্ছেন এটা তার স্বাক্ষর! রাষ্ট্র প্রধান বললেন, সব বুঝলাম কিন্তু এইটা বুঝলাম না মুর্গির লাগাম থাকে কেম্নে? উটের থাকে ঘোড়ার থাকে তাই বলে মুর্গির? ভাস্কর আরও আঠালো হয়ে গিয়ে বলল, মহামান্য ওটা রূপক অর্থে! মানে আপনি লাগামটা ধরে আছেন বলেই সঠিক পথে চলছে ঊর্ধ্বশ্বাস! রাষ্ট্রপ্রধান বলল, এই শালা! স্যরি! এই শিল্পী কঠিন মাল এরে মোটা অঙ্কের রেমুনেসন দিবা! যা পাবে তার তিনগুন দিয়া দিও! একটা ব্যতিক্রম ভাস্কর্য আছে যার নাম ‘ইচ্ছে’! এটাই একমাত্র গলাছেলা মুর্গির ভাস্কর্য! রাষ্ট্রপ্রধান ভাস্করকে ডেকে জিজ্ঞাসজিজ্ঞেস করলো, তোমার কাজটা আমার ভাল্লাগছে! ছোটকালে কতো গলাছিলা মুর্গি খাইছি! স্মৃতি কাতর করে ফেলছ! কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো, তোমার গলা ছিলা মুর্গি যে কিনা অনেক দূরে তাকায়ে আছে, বুঝলাম সে সুদূরের পিয়াসী ! কিন্তু ইচ্ছে নাম দিলা ক্যা? তোমার ব্যাখ্যা কও! ফলে ভাস্কর বলল, আমার ব্যাখ্যা হচ্ছে স্যর, এই গলা ছেলা মুর্গি স্বপ্ন দেখে বড় হলে সে উটপাখি হবে! তাই এর নাম ইচ্ছে! এই বাক্য শোনা মাত্র রাষ্ট্রপ্রধান বললেন, তুমি জিনিয়াস!
কিন্তু রাষ্ট্রপ্রধান যেই ভাস্কর্যটি নিজে উদ্বোধন করবেন সেটা সবথেকে দুর্দান্ত। যদিও ডিজাইন আহ্বান করার পর এই ডিজাইনটার ভাস্করের কল্লা ফেলে দিতে চেয়েছিল, ছুরিকাঁচি মন্ত্রী। কিন্তু রাষ্ট্রপ্রধান একরকম তাকে নিজেই বাঁচিয়েছেন এবং স্বীকৃতি দিয়েছেন যে, এই ভাস্কর সবচেয়ে মেধাবী। যার প্রমাণ তার শিল্পকর্ম! ফলে ভাস্কর এই স্বীকৃতিতে কিছুক্ষণ থ মেরে থাকে! এই ভাস্কর্যটি পিতলের সঙ্গে যন্ত্রকৌশলের প্রয়োগ করা হয়েছে। একটি অতিকায় পিতলের মুর্গি যে কিনা ডিম পাড়তে বসে আছে। তার পিছনের থেকে একটা ডালা খুলে যায় বা পায়ু উন্মোচিত হয়ে যায় আর তার থেকে একটা ডিম গড়িয়ে আসতে থাকে, এবং তিনটে গড়ানি দিয়েই ডিমটা দুইভাগ হয়ে যায় আর তার থেকে একটা মুর্গির বাচ্চা বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে গিয়ে একটা গর্তে পড়ে। কিন্তু এই ভাস্কর্যের মূল রহস্য হল, মুর্গির বাচ্চার মাথা। প্রতিটা ডিম ফেটে বের হওয়া মুর্গির বাচ্চার মাথায় রাষ্ট্রপ্রধানের মাথা লাগানো। এই জিনিসটা দেখে রাগে দাউদাউ করে ছুরিকাঁচি মন্ত্রী ভাস্করকে যখন হত্যা করতে উদ্দ্যত হয় তখন রাষ্ট্রপ্রধান তাকে ডেকে পাঠায়। এবং তার আইডিয়ায় চমকিত হয়ে রাষ্ট্রীয় প্রধান ভাস্কর পদে নিযুক্ত করেন। রাষ্ট্রপ্রধান মন্ত্রীদের বলেন, আমরা তো চাই জনগণের মাথার ভেতর মুর্গি ঢুকিয়ে দিতে। ফলে মুর্গি আইডিয়ার জন্য এটা ইউনিক। আর যেহেতু আমার জামানার চিহ্ন আমি। ফলে প্রতিটা মুর্গির সঙ্গে আমার মাথা তাদের মনের মধ্যে ঢুকে যাবে। যেটা তাদেরকে আদর্শ মুগি হতে সাহায্য করবে।
ভাস্কর্য উন্মোচনের পর সেখান থেকে রাষ্ট্রপ্রধান রওয়ানা হন জাতীয় ময়দানের দিকে সেখানে তার জন্য অপেক্ষা করছে বিরাট জমায়েত। সেই জমায়ে্ত আজ ভাষণ দেবেন তিনি, এবং সেখান থেকে নতুন প্রজাতির মুর্গি অবমুক্ত করবেন। রাষ্ট্রপ্রধানের গাড়িতে মহা বিজ্ঞানীকে ওঠানো হয়েছে, তিনি রাষ্ট্রপ্রধানকে এই নতুন প্রজাতির মুর্গি বিষয়ক ব্রিফিং দেবেন। এই মুর্গির গুণাগুণ ইত্যাদি। গাড়িতে উঠে মহা বিজ্ঞানী জড়সড় হয়ে থাকলেন। তার সব সময়ই অস্বস্তি হয় রাষ্ট্রপ্রধানের সামনে এলে। সে যখনই রাষ্ট্রপ্রধানের দিকে তাকায় তখনই চোখে দেখেন এটা যেন একটা মানুষ নয় একটা বন্য শূকর! রাষ্ট্রপ্রধান আলাপ শুরু করেন। রসিকতার সুরে বলেন, বিজ্ঞানী কেমন আছো? বিজ্ঞানী বলে, জি ভালো! তিনি বলেন, শুধু ভালো? বিজ্ঞানী বলেন, মহা ভালো! তিনি বলেন, কি বল্লা মহা ভালো? সর্বনাশ তুমি তো দেখি রাষ্ট্রদ্রোহী ! রাষ্ট্রের এই ক্রান্তিকালে তুমি মহা ভালো আছো? যখন আমাকে মেরে ফেলার জন্য ষড়যন্ত্র হচ্ছে আর তুমি মহা ভালো দিন কাটাচ্ছ! ছি ছি বিজ্ঞানী! ফলে বিজ্ঞানীর চোখমুখ শক্ত হয়ে আসে। তার মনে হতে থাকে যে কোন মুহূর্তে এই লোকটা তাকে গাড়ি থেকে ছুঁড়ে ফেলে দেবে! তখন রাষ্ট্রপ্রধান বলেন, দেখি বিজ্ঞানী, তোমার দাঁত ইইইইই করো তো! ফলে বিজ্ঞানী আরও ভয় খায়! রাষ্ট্রপ্রধান বলে, আরে সামনের পাটির দাঁত দেখাও গাধা! ফলে বিজ্ঞানী বাচ্চাদের মতো ইইই করে দাঁত বের করে! রাষ্ট্র প্রধান হতাশ চোখে বলে, নাহ! নাই! তোমার দাঁত ভাঙা নাই! তুমি কি আমার ব্যথায় ব্যথিত হও নাই? ফলে বিজ্ঞানী মহা চাপ খেয়ে পাথর হয়ে যায়। রাষ্ট্র প্রধান বলে, আমার খাবা আমার পরবা আর আমার জন্য একটু সমব্যথী হবা না!? ছি ছি বিজ্ঞানী! তোমরা মেধাবীরা একটু বেশিই নেমকহারাম! সারা দেশের আমলা মন্ত্রী কর্মকর্তারা আমার ব্যথায় ব্যথিত হয়ে সামনের দুটো দাঁত ফেলে দিচ্ছে আর তুমি বত্রিশপাটি দাঁত কেলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছ? তোমার লজ্জিত হওয়া উচিৎ! এবার বিজ্ঞানী হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন। বয়সী একজন লোকের এমন কান্না দেখা যায় না। যথেষ্ট অস্বস্তিকর! বিজ্ঞানী কাঁদতে কাঁদতে বলে, আমি দুঃখিত স্যর আমি না আসলে জানি না কেন সবাই দাঁত ফেলে দিয়েছে! এই কথা শুনে প্রধানমন্ত্রী নিজেই মনে মনে একটা ধাক্কা খায়। প্রথমত তার মনে হয়, তিনি কি কোনো গাছ পাথরের সঙ্গে কথা বলছেন? দ্বিতীয়ত তার মনে হয়, তার প্রচারমাধ্যম কি এতোই দুর্বল যে তারই পালাপোষা বিজ্ঞানী জানে না যে তার দুটো দাঁত ভেঙে গেছে! ফলে তিনি কিছুটা ভারাক্রান্ত হয়ে যান এবং কয়েক সেকেন্ড বিরতি নিয়ে বলেন, আচ্ছা বাদদেও এবার তোমার আবিষ্কার করা নতুন প্রজাতির মুর্গি সম্পর্কে জ্ঞান দাও! ফলে বিজ্ঞানী এবার কিছুটা স্বস্তি ফিরে পায়। বিজ্ঞানী বলে, এই মুর্গি মহান মুর্গি! আপনি যা যা গুনাগুন চেয়েছিলেন তার সবই এই মুর্গির ভেতর আছে! এবং প্রয়োজনে আরও নতুন নতুন গুনাগুন এর সঙ্গে যোগ করা যাবে। এই মুর্গির নামকরণ করা হয়েছে দাস মুর্গি! অর্থাৎ ক্রীতদাসের মতো নানান গুনাগুন এর। রাষ্ট্রপ্রধান বলল, ধুর বাঁড়া এক কথার ঘুরপাক খাচ্ছ ক্যান? আগে বল, এই মুর্গি কক্ কক্ করে কিনা! মুর্গির কক্ কক্ আমার পছন্দ না! বিজ্ঞানী বলে, মোটেই না। এই মুর্গি একেবারেই বোবা! জন্মের পরও এরা সাউন্ড করে না। খিদে লাগলেও কথা বলে না। ব্যথা লাগলেও গোঙায় না। এর চোখ খুব বেশি দূরে দেখে না। এরা শোনে অল্প! সূক্ষ্ম শব্দ শুনতে পারে না। উড়তে পারে না। খুব দ্রুত দৌড়াতে পারে না। এদের চাইলেই ধরা যায়। কোন লড়াইয়ের মধ্যে এরা নেই। কোন মারামারি কাটাকাটির কথা এদের চিন্তাতেই আসে না। এরা শুধু খাবে আর হাগবে। এরা মাংস দেবে, ডিম পাড়বে ব্যস! রাষ্ট্রপ্রধান বিজ্ঞানীর উরুতে একটা চাপড় মেরে বলেন সাবাস! এবার বিজ্ঞানী বলে, স্যর আরেকটা সুসংবাদ আছে। রাষ্ট্রপ্রধান বলে, আরও? বলো বলো! বিজ্ঞানী বলে, আমি একটা বিশেষ ভ্যাকসিন আবিষ্কার করেছি যেটা কোন মানুষের উপর প্রয়োগ করলে সেও মুর্গি হয়ে যাবে! বোবা হয়ে যাবে, বেশি দূরে দেখবে না, কানেও শুনবে কম, আর তারচেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হল, তারা কোনো কিছু চিন্তা কোরতে পারবে না। রাষ্ট্রপ্রধান বিস্ময়ে থতমত হয়ে বলে, এও সম্ভব? এই তো চাই! এবছরের রাষ্ট্রীয় পুরস্কার হীরকদ্যুতি তোমার কান্ধে যাবে!
রাষ্ট্রপ্রধান যখন মঞ্চে উঠলেন তখন দেখলেন তার সামনে বিরাট জমায়েত। দাঁত ভাঙা ষড়যন্ত্রের পর এই প্রথম তিনি জনসমুখে আসলেন। ফলে জমায়েত দেখে তার ভালো লাগলো। মন্ত্রী আমলা উচ্চপদস্থ থেকে শুরু করে বণিকেরা সবাই। কিন্তু কোথাও কোন চিৎকার, শ্লোগান, স্বাগত মত্ততা কিংবা করতালি নেই। যেন এই হাজার হাজার লোকেরা সবাই বোবা। ফলে তার অস্বস্তি হতে থাকে। নিজের পায়ের জুতোর শব্দে নিজেই বিব্রত বোধ করেন। যখন মাইক্রোফোনে তিনি ভাষণে দাঁড়ালেন তখন বললেন, …প্রিয় দেশের জনগণ, আপনাদের শক্তিই আমার বেঁচে থাকার সুর! পরাজিত শক্তির ছায়ারা আমাকে হত্যার জন্য পরিকল্পনা করিয়াছিলো। এবং যথার্থই তাহারা পরাজিত হইয়াছে। তাহাদেরকে মনে করাইয়া দেওয়া প্রয়োজন যে, তাহারা এইটুকু জানুক, আমি আমার বাহিনী দ্বারা আমাকে সুরক্ষিত করিয়াছি! যা আমিই ভাঙ্গিতে পারি কেবলমাত্র এবং আমার সৈনিকেরা শক্তিমান। বিদ্রোহ বা বিপ্লব বা প্রতিবাদ বা রাষ্ট্রদ্রোহ কঠিন হাতে দমন করা হইবে। নির্দয় সে হাত সম্পর্কে আপনাদের বিন্দুমাত্র ধারণা নাই। আমরা হার্ড লাইনে রাষ্ট্র পরিচালনায় বিশ্বাসী রাখি। যে ঊর্ধ্বশ্বাসে রাষ্ট্রিক উন্নয়ন আমি আগাইয়া নিতেছি, আপনাদের প্রয়োজনীয় সকল কিছু তৈয়ার করিয়া দিতেছি তাহার ভেতর কেউ নাক গলাইলে সেই নাক কর্তন করা হইবে। সতর্ক হউন যারা মনের মধ্যে ঘুঘুর চাষ করেন! সরকার বিরোধিতা যাদের ধিয়ান, আমি জানি সর্ষের ভেতরেই ভূত থাকে, সেই ভূতদের বলিতেছি আপনারা সংযত হউন। নইলে আপনাদের খুঁড়ে বের করে আনিবার চলমান প্রক্রিয়ায় যাদেরকে পাওয়া যাইবে তাদের জন্য কোন করুণা অপেক্ষা করিতেছে না। আমি আমার একচ্ছত্র পরিকল্পনার বাহক এবং ধারক, আমার ভাবনার জন্য আমি সকল প্রকার সিদ্ধান্ত গ্রহণে অকপট, আমি আপনাদের সহযোগিতা চাইতেছি মানে এই না যে আমি বিনীত, যারা পাশে থাকিবেন না তাহাদেরকে আমি বাহির করিয়া দিবো। সৃজনশীল বা ব্যতিক্রমী কোনো চিন্তা করিবার সুযোগ আমার রাষ্ট্রে থাকিবে না। যারা বিচিত্র চিন্তা করিতে আগ্রহী তাহারা দেশ ছাড়তে পারেন নইলে অকরুণ এক চিকিৎসা তাদের জন্য অপেক্ষা করিতেছে। চিন্তা তাই করিবেন রাষ্ট্র যাহা চিন্তা করায়। সৃজনশীলতা হবে তাহাই যাহা রাষ্ট্র চায়। আজকের এই মহান দিনে আমি আমাদের চিন্তার ফসল এক দুর্লভ প্রজাতির মুর্গি আমার দেশের মাটিতে অবমুক্ত করিতে যাইতেছি। যেই মুর্গি থেকে আপনাদের শিক্ষণীয় অনেক কিছুই আছে। এটা আপনাদের জন্য একটি মডেল হইতে পারে। বাঁচিয়া থাকিতে হইলে মুর্গির মতো হও।
বক্তৃতা এই পর্যন্ত আসার পরেও একটা করতালি কিংবা শ্লোগান শোনা গেলো না। রাষ্ট্রপ্রধানের নিজেরই ক্লান্ত লাগতে লাগলো। যেন তিনি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ভাষণ দিচ্ছেন। ফলে তিনি ভাষণ শেষ করলেন। আর এই আচমকা ভাষণ শেষ হয়ে যাওয়ায় কল্যাণ মন্ত্রী যিনি এখন মুর্গি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন তিনি বুঝে ফেললেন। তিনি এগিয়ে গিয়ে বললেন, জীবনে এতো অসাধারণ ভাষণ আর শুনি নাই স্যর! রাষ্ট্র প্রধান সামান্য পালে হাওয়া পেলেন। তিনি বললেন, এরপর কি কর্মসূচী ? কল্যাণ মন্ত্রী বললেন, দাসমুর্গি অবমুক্তকরণ! এই ছড়িয়ে যাবে সারা শহরে। তারা ঘুরে ফিরে খুঁটে খাবে। ফলে রাষ্ট্রপ্রধান যখন দাসমুর্গি অবমুক্ত কোরতে যাবে তার কয়েক সেকেন্ড আগেই একটা খাঁচার কপাট খুলে হুড়মুড়িয়ে দাসমুর্গির লক্ষ লক্ষ বাচ্চা বেরিয়ে ছড়িয়ে যেতে লাগলো সমাবেশ অঞ্চলে। যেহেতু দর্শকেরা কেউ কোনো শব্দ করবে না, ফলে কিছুক্ষণের মধ্যে দেখা গেলো দাসমুর্গির বাচ্চারা বসে থাকা দর্শকের গায়ে মাথায় দুই উরুর মাঝখানে বুকের খাঁজে বসে হেঁটে ছোটাছুটি কোরতে লাগলো। উপস্থিত জনতা বুঝতে পারলো কোনো একটা যান্ত্রিক জটিলতা ঘটেছে তবু তারা কেউ কোনো শব্দ করলো না। রাষ্ট্রপ্রধান শুধু বলল, চলো বাসায় ফিরবো। সারা দেশে এই মুর্গি অবমুক্ত করে দাও। ফলে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যেহেতু এই মিটিঙয়ের সমস্ত প্রচার সরাসরি সমগ্র দেশে হচ্ছিল ফলে সব শহরে এক নির্দেশনায় মুর্গি অবমুক্ত করা হল। রাষ্ট্রপ্রধান হাত নেড়ে সম্ভাষণ জানাতে জানাতে কল্যাণ মন্ত্রীকে বলল, মনে হচ্ছে যেন গোরেস্তানে হাত নাড়াচ্ছি। সব যেন মৃত, একটা চিৎকার নেই একটা হাসি নেই, ক্যামেরার শব্দও নেই। ব্যাপার কি? কল্যাণ মন্ত্রী বলল, স্যর আমরা প্রেস কে পুরা নিয়ন্ত্রণ করে ফেলেছি। পাউডার বানায় ফেলছি প্রেস। শুধুমাত্র ক্যামেরা থাকবে আমাদের হাতে। আর সামনের মাস থেকে দেশে ক্যামেরাওয়ালা ফোন ইউজ বন্ধ, আমদানিও বন্ধ। শুধুমাত্র সরকারী আমলারা বিশেষ ব্যবস্থায় ক্যামেরাওয়ালা ফোন ব্যবহার করবে। পোলাপানের হাতে ক্যামেরা থাকা মানে আমাদের ধরা খাওয়া। রাষ্ট্রপ্রধান বলল সাবাস! তুমি আমার সঙ্গে আসো। আলাপ আছে! মঞ্চ থেকে যখন তারা নামবে তখন মঞ্চের সিঁড়িতে একটা দাসমুর্গির বাচ্চা দৌড়ে এসে পড়লো, রাষ্ট্র প্রধান বিরক্তি নিয়ে একটা লাথি দিয়ে সরিয়ে দিলেন। এবং দেখলেন ছিটকে গিয়ে মুর্গিটা উল্টে পড়ে আবার উঠে দাঁড়িয়ে তার দিকেই এগিয়ে আসতে লাগলো। কল্যাণমন্ত্রী বলল, আবার আপনার লাথি খেতে আসছে। এদের লাথি খেয়েও শিক্ষা হয় না। রাষ্ট্রপ্রধান এবার একটা জোরে কিক দিয়ে এগিয়ে গেলেন। গাড়িতে বসে তিনি কল্যাণমন্ত্রীকে বললেন, সমস্যাগুলো কি বুঝতে পারছ? ভূত কিন্তু জ্যান্ত আছে! আমি উদ্বোধনের আগেই ডালা খুলে দিয়েছে। কল্যাণ মন্ত্রী বলল, বলেন কি? তাই নাকি? আমি তো ভাবলাম আপনার হাতের চাপে আগেই খুলে গেছে। রাষ্ট্রপ্রধান বলল, না। এবং এই প্রজাতির মুর্গি নিয়েও আমার সন্দেহ হচ্ছে! বিজ্ঞানী কোন আলাদা খেলা খেলে নি তো? যারে লাথি দিলাম সে আবার লাথি খাইতে আসবে এইটা কি আনন্দের কথা? কল্যাণমন্ত্রী হা হয়ে চিন্তা কোরতে লাগলেন বিজ্ঞানী কি আর খেলতে পারেন মুর্গি নিয়ে। তার কাছে মুর্গি মানেই ঝলসানো মাংস। ঠিক তখন কল্যাণ মন্ত্রীর ফোন বেজে উঠলো। তিনি যে খবর পেলেন সেটা রাষ্ট্রপ্রধানকে এভাবে দিলেন, স্যর দেশের কোন এক গ্রামের বাসিন্দারা নাকি সব মুর্গি বের করে দিয়েছে গ্রাম থেকে। তারা সবাই নিজেদের ব্যক্তিগত মুরগিও ছেঁড়ে দিয়েছে। এবং তারা মুর্গি খাওয়া আজ থেকে বাদ দিয়ে দিয়েছে। জাতীয় পাখি হিসেবে তারা মুর্গি খেতে নারাজ। খবর শুনে রাষ্ট্রপ্রধান কামান মন্ত্রীকে ফোন দিলেন, এবং হুকুম দিলেন যেই গ্রামের লোকেরা মুর্গিকে অস্বীকার করেছে সেই গ্রাম পুরাটাই জ্বালিয়ে দিতে। ফলে সেদিন যখন পুলিশ গ্রামটাকে পুড়িয়ে দেবার জন্য ঘিরে ফেলল। পুলিশ নিজেরাই অবাক হয়ে দেখল সারা গ্রাম জ্বলছে দাউদাউ করে আর মানুষেরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে। ফলে পুলিশ জিজ্ঞাস করলো ব্যাপার কি? গ্রামের লোকেরা বলল, বাড়িঘর আগুন জ্বালিয়ে দিলাম। আমরা সবাই এখন থানায় যাচ্ছি। পুলিশরা বলল, থানায় কেন? লোকেরা বলল, আমরা সবাই থানায় আশ্রয় নেবো। ফলে পুলিশরা কিছুই বুঝতে পারলো না। এবং এইখবর রাজধানীতে যখন এলো তখন কেউ কেউ বলল, দারুণ তো! এতো কঠিন ষড়যন্ত্র! কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। ফলে পুলিশরা এও জানালো গ্রামের লোকেরা খুব শান্ত এবং স্বাভাবিক আছে সব কিছু পুড়িয়ে দিয়ে। হয় তারা পাগল হয়ে গেছে নাইলে অন্য কোন মতলব আছে। রাষ্ট্রপ্রধান বিজ্ঞানীকে খবর পাঠালেন। আর গ্রাম থেকে তার কাছে পাঠানো ভিডিও ফুটেজ দেখতে লাগলেন, দাউদাউ করে পুড়ে যাচ্ছে গ্রাম আর জনগণ স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে জ্বালিয়ে দিয়ে তাকিয়ে দেখছে নিজেদের ঘর পুড়ে যাওয়া।
প্রচ্ছদঃ সুমন মুখার্জী