(ঠ)
সূর্য তুমি জাগো
মানুষ যৌথ হয়,
মানুষ যৌথ হলে
আঁধার আগুন হয়।
রান্তাই উৎসবের বিভিন্ন পর্বের উল্লাস আজ চারদিকে। সন্ধ্যা থেকে শুরু হবে নাচ গান উন্মাদনা। যুবক যুবতীরা নিজেদের শান দিচ্ছে রাতের জন্য। ওদিকে মূল খেলার ভেঁপু বেজে গেছে কিছুক্ষণ আগে। মহাপাপ নামক যেই শূকরটি পালন করা হয় সারাবছর খাইয়ে পড়িয়ে, পুরোহিতেরা বলে, এই শূকরের সমগ্র শরীরে জমা হয় রাজার সারাবছরের পাপ। এবং এটা একজন বীরের হাতে হত্যা করা হলে এবং ভস্ম করা হলে নির্বাণ হয়। নিয়মটা মজার, অরণ্যের একদিক থেকে এই সোনার ঘণ্টা বাঁধা শূকর ছেড়ে দেয়া হবে, একদিক থেকে অপরাধী তিন বন্দিকে ছেড়ে দেয়া হবে আর অন্য একদিকের সাতমুখ থেকে সাতজন বীর ঢুকবেন! শুধুমাত্র বীরদের হাতেই অস্ত্র। অপরাধীদের হাত শূন্য তবে তারা জঙ্গলের ডাল পাথর ব্যবহার কোরতে পারবে। অরণ্য ভর্তি আছে শ্বাপদ। খেলার শেষে শূকরটাকে হত্যা করে আগুন জ্বেলে দিয়ে তার গলার ঘণ্টা নিজের গলায় বেঁধে ফিরতে হবে। বীরদের শত্রু বীরেরাই কেনোনা, একজনই বীর নির্বাচিত হবে, ফলে অন্য বীরদের নিজেদের নিজেদেরকে হত্যা কোরতে হবে, শূকর এবং অপরাধীদের হত্যার পাশাপাশি তাদের নিজেদেরকেও হত্যা কোরতে হবে বিজয়ী হবার জন্যে। সাতজন বীর জঙ্গলের সাত দুয়ার থেকে প্রবেশ করে, তিনজন অপরাধী বিপরীত তিনদিক থেকে আর মাঝখান থেকে প্রবেশ করবে শূকর। কিন্তু মাঝখান বলতে আসলে কোন মাঝখান সেটা পরিষ্কার নয়। ফলে প্রতিযোগিতার শুরুর কিছু পর দূরবীন দিয়ে যারা প্রাসাদের উপর থেকে তাকিয়ে থাকলো তারা দেখল, জঙ্গলের কোথাও গাছপালা নড়ে উঠলো তো পাখিদের উড়াউড়ি হতে লাগলো। ফলে তারা মনে করলো একজন কেউ কারো হাতে ঘায়েল হল, নাকি হিংস্র পশুর আক্রমণে? কিছুক্ষণের মধ্যে দেখা গেলো জঙ্গলের বিভিন্ন জায়গার গাছ নড়ে উঠছে ফলে রাজমহলের মানুষে রা উৎফুল্ল হল এই ভেবে যে খেলার আসল লড়াই জমে উঠছে ক্রমশ! কিন্তু জঙ্গলের ভেতরের অবস্থা কি? জঙ্গলের ভেতরের সাতজন বীরের পাঁচজন পশু শিকারের ফাঁদে আটক চিৎকার চেঁচামেচি করছে। আতঙ্কে কেউ কেউ কাবু হয়ে পড়েছে। নীরন্ধ্র ঘন জঙ্গল তাদের মনোবল চুরমার করে দিয়েছে, এখানে দিনের আলোতেও মানুষ চাইলেই নিজেকে লুকিয়ে ফেলতে পারে। কারোর চিৎকার অন্য কারো কানে পৌঁছাবার উপায় নেই। অন্য দুইজন বীরের একজন সাপের কামড়ে মৃত্যুর মুখোমুখি। সপ্তমজন শুধুমাত্র সচল! আর সেই তিনজন অপরাধীর তিনজনই বেঁচে আছে। তারা জঙ্গলে ঢুকে গাছে চড়ে চুপচাপ বসে আছে। ফলে তারা অপেক্ষা কোরতে থাকে আসল সময়ের। বন্য শূকরটি ছুটে বেড়াচ্ছে। ফলে অরণ্যে আপাতত একজন বীরের ব্যস্ততা।
কিন্তু সন্ধ্যা যখন নামলো তখন যেন অরণ্য জেগে উঠলো। অরণ্যের ভেতর যেন এক গ্রামের অস্তিত্ব টের পাওয়া যেতে লাগলো। আকাশে চাঁদের আলোর বিভা ম্লান হয়ে চারদিক থেকে অরণ্যে এসে ঢুকছে। পাতার নক্সার ফাঁকে ফাঁকে মানুষের মুখ। সেই মানুষের সংখ্যা একজন দুইজন বা তিনজন নয় শত শতজন। শীর্ণ, রক্তশূন্য চেহারার মানব মানবীরা। তাদের দিকে তাকালে মায়া হয়। মনে হয় অসুখেবিসুখে অভাবের যন্ত্রণায় আধপেটা মানুষগুলো বেঁচে আছে মাত্র। তবু তাদের চোখ গুলোতে যেন তীরের ছিলার মতো টানটান ক্রোধ আর বিশ্বাস! শিকারের ফাঁদে আটকে পড়া পাঁচজন বীরকে তুলে আনা হয়েছে। গুল্মলতার চিকিৎসা চলছে তাদের। আর সেই মুক্ত বীরকে পিটিয়ে আহত করে তুলে আনা হয়েছে। আহত বীরেরা এইসব মানুষদের মুখ দেখে বিভ্রান্ত হয়। সেই তিনজন অপরাধীকেও এই মানুষদের সঙ্গে কথা বলতে দেখে। এবং তারা বুঝতে পারে এই মানুষগুলোর সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ আছে। সেই বামন নেফ্রা এগিয়ে এলো। সে কোমরে হাত বেঁধে আহত বীরদের দিকে বলল, ভয় পাবেন না। এখানে রাজা নেই। যদিও আপনারা শৃঙ্খল ভালোবাসেন আর তাই বোধহয় অমন বাজিতে নিজের নাম লিখিয়ে রাজকন্যা বিজয়ে নামেন। যে শিকারের ফাঁদে আপনারা আটকা পড়েছিলেন সেগুলোও আমাদেরই পাতা। নেফ্রা বলে চলে, আপনাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেই। চারদিকে যেই শীর্ণ মানুষ গুলোকে দেখতে পাচ্ছেন। এরা সবাই রাজার খড়গের তলা দিয়ে পালিয়ে বেঁচে ফিরেছে। ঐ যে শত শত মেয়েদের দেখছেন ওরা আপনাদেরই গ্রামের। মেয়েদের গ্রাম থেকে তুলে নিয়ে যাওয়াটা খুবই সাধারণ ঘটনা রাজ পেয়াদাদের বেলায়। নিজেদের বাঁচাতে কিংবা এই অপশাসন থেকে বেরিয়ে আসতে গ্রামের শত শত মেয়ে জঙ্গলে পালিয়ে এসেছিলো বলে যেই গুজব রাজ্যে শুনতেন, তার জ্যান্ত চেহারা দেখুন আপনাদের চারপাশে। রাজা জঙ্গলে নির্বাসনের নামে যেইসব চিন্তক বা প্রথাবিরোধীদের এখানে পাঠাতেন ‘বেঁচে থাকতে পারলে বেঁচে যাও নইলে শ্বাপদের পেটে যাও’ শিরোনামের যেই সিংহাসন রক্ষার জন্য বিদ্রোহীদের নির্বাসন দেবার পদ্ধতি চালু আছে, তাতে যেই গণ্ডায় গণ্ডায় চিন্তকদের রাজ্য ছাড়তে হয়েছিলো তাদের অনেকেই এখানে আছে। এই অরণ্য নিপীড়িত মানুষদের আশ্রম হয়ে উঠেছে। ফলে আমাদের একটা দল আছে যারা বহুরূপী। যারা ভয় দিয়ে বাঘের গর্জন, শ্বাপদের চিৎকার নকল করে অরণ্যের বাইরের মানুষদের কাছে অরণ্যের ভীতিটা জ্যান্ত রাখে। আর আছে গ্রামে গ্রামে আমাদের নেতা আর সহমর্মিরা। যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমাদের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। আমরা এই রাজার পতনের জন্য এই ব্যবস্থা ভাঙার জন্য নিজেদের বাঁচাবার জন্য এই লড়াই করছি। এতো কিছু কেন বললাম এটা একটা প্রশ্ন? আমিই উত্তর দিচ্ছি। আপনাদের রাজা খুব বেশি বুদ্ধিমান হবার পরও একটা টোপ গিলে ফেলেছেন। আর সেই ভুলের মাশুল দেবার রাত্রি আজ। আজ এই উৎসবের উদ্দাম রাতেই তার প্রাসাদ পতনের পরিকল্পনা আমরা করেছি। আমাদের অস্ত্রশক্তি খুব বেশি নেই। তবে আমরা জনগণকে সঙ্গে পাবো আশা করি। হয় আমরা আজ জিতে যাবো নইলে আমরা শেষ হয়ে যাবো। আপনারা ভাববেন না, আপনাদের আমরা সঙ্গে নেবো। আপনাদের প্রাণে আমরা মারবো না। সুস্থ করে ফেরত পাঠিয়ে দেবো গ্রামে। কেনোনা আপনারা সবাই লোভী। ভীষণ লোভী। লোভের জন্য আপনারা নিজেদের মুক্ত জীবন ফেলে রাজবাড়ির নাঙ হতে প্রতিযোগিতায় নেমেছিলেন। কিন্তু আপনারা জানেন জনগণ বিশ্বাস করে ঐ যে শূকরটি ওটার পেটের মধ্যে সমস্ত বছরের পাপ জমা হয়ে আছে। ব্যাপারটা তারা খুব গাড় ভাবে বিশ্বাস করে। এবং নিয়ম হচ্ছে ঐ শূকরটি যেখানে যাবে সেখানে আগুন দিয়ে ভস্ম করে দেয়া হবে। ওর গলার ঘণ্টা খুবলে নিয়ে ফিরবে বীর! আমরা এখন আপনাদের একমাত্র অক্ষত বীরকে নির্দেশ করছি আপনি আমাদের সাহায্য করবেন। কারণ সাহায্য করলে আপনাকে বাঁচিয়ে রাখা হবে।
অরণ্যের বাইরে উৎসব তখন জমে ক্ষীর। নাচ গান আর সুরের সঙ্গে মদ মিলেমিশে একাকার। গঙ্গন গাছের আড়ালে তরুণ তরুণীরা গভীর প্রেমে মগ্ন। চারদিকে উৎসবের গন্ধ ম ম করছে। শুধুমাত্র রাজপ্রাসাদে একটা চিন্তার ক্ষীণ সুর ঘুরপাক খাচ্ছে। সারাদিন চলে গেলো একটা হুংকার নেই জঙ্গলে। আর ঠিক তখনই আচমকা জংল থেকে বাঘ আর শ্বাপদের বিকট চিৎকার শোনা যেতে লাগলো। কেউ কেউ বলল, ব্যাপার কি চরম লড়াই শুরু হল নাকি? কেউ কেউ বলল, না মনে হয় বাঘে বাঘে লড়াই বেঁধেছে। কেউ বলল, উঁহু এ তেমন শব্দ না কোন জটিলতা হয়েছে জঙ্গলে। সব প্রাণী এক সাথে আর্তনাদ করছে। আগুন লেগেছে নাকি? কিছুক্ষণের মধ্যে জঙ্গলের নিকটবর্তী ওয়াচ টাওয়ার থেকে খবর পাওয়া গেলো যে, মহাপাপবাহী শূকরটি জঙ্গল থেকে বেরিয়ে রাজ্যে ভেতরে দৌড়ে আসছে আর তার পেছনে একটা ঘোড়ায় চরে একজন বীর! ফলে, প্রাসাদে এই খবর যখন পৌঁছালো তখন রাজা রানী এবং রাজ চিন্তকদের সবার ভ্রু কুঁচকে আসলো। ঠিক একই সময়ে উৎসবের ভিড়ের ভেতরে একটা খবর দ্রুত মুখ থেকে মুখে ছড়িয়ে গেলো, মহাপাপবাহী শূকরটি লোকালয়ে ঢুকে গেছে সেটা রাজপ্রাসাদের দিকে যাচ্ছে। ফলে লোকেরা সবাই যে যার মতো উৎসব ফেলে রাজ প্রাসাদের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলো, যেতে যেতে খবরটা হয়ে গেলো, রাজ প্রাসাদের ভেতরে শূকরটি ঢুকে গেছে। এবং যখন দ্বাররক্ষী দেখতে পেলো, শূকরটি দৌড়ে এগিয়ে আসছে তখন সে আটকাবার কোন উপায় পেলো না দরজা। কেনোনা উৎসবের দিন সিংহদরজার কপাট অষ্টপ্রহর উন্মোচিত থাকে। কেবল প্রহরীরা সামনে দাঁড়িয়ে পাহারা দেয়। ফলে শূকরের পেছনে ঘোড়ায় চড়ে বর্শা হাতে এগিয়ে আসছে একজন বীর। ফলে সবাই সরে দাঁড়ালো। শূকরটি ঢুকে গেলো রাজ প্রাসাদের আঙ্গিনায়। বীর ঘোড়া থেকে নামতে না নামতেই দেখা গেলো একটা বিরাট জনস্রোত রাজপ্রাসাদের আঙ্গিনার দিকে এগিয়ে আসছে। কে যেন চিৎকার দিয়ে বলল, এই প্রাসাদ হচ্ছে আমাদের পাপের মূল কেন্দ্র, দেখলে না শূকরটা প্রাসাদে ঢুকে গেছে! এটাকে ভাঙো। ফলে হুড়মুড় করে লোকেরা প্রবেশ কোরতে লাগলো। চারদিকের কপাট গুলো মড়মড় করে ভেঙে ফেলতে লাগলো। হঠাৎ দেখা গেলো কোথাও আগুন জ্বলে উঠলো। রাজ প্রাসাদের ভেতর পুরো ব্যাপারটা বুঝতে আর কারোর বাকি নেই। রাজ পরিবারে গুরুত্বপূর্ণ লোকেরা সুড়ঙ্গ দিয়ে পালিয়ে যেতে রওয়ানা হল। কেনোনা সৈনিকেরাও বিশ্বাস করে যেহেতু মহাপাপবাহী শূকরটি প্রাসাদে ঢুকে গেছে সেহেতু এই প্রাসাদ পাপের আধার! এটাকে রক্ষা করার আর কোনো উপায় নেই। অন্ধ আচার্য পুরোহিত শুধু একা তাঁর কক্ষে বসে থাকলেন, তার বয়স যেন এই মহলের পতন শুনবার জন্য অপেক্ষায় ছিল।
প্রাসাদ পতনের পরদিন ভোরের প্রথম আলোয় দেখা গেলো প্রাসাদের একটু দূরে ঘাসের উপর রাখা একটা টেবিলের উপর বসে পা দোলাচ্ছে নেফ্রা। পাশে তার স্ত্রী। স্ত্রীর হাতে ধারালো ছোরা। প্রাসাদ থেকে আগুনের ধোঁয়া আকাশের দিকে উঠছে। ভেতরে মানুষের চিৎকার গমগম করছে। চারদিকে ভাঙাচোরা। বোঝা যাচ্ছে যথেষ্ট পরিমাণ অন্যায় হচ্ছে এখনো, প্রাসাদ লুট হচ্ছে। নেফ্রার আপাতত কিছু করার নেই। এই উন্মাদ জনগণ এবং তার দলের এই নির্বোধ লোভীরা কিচ্ছু শুনবে না। এদের শান্ত কোরতে কিছুদিন সময় লাগবে। লাগাম ছেড়ে দিলে এম্নিতেই ক্লান্ত হয়ে পড়বে। কিন্তু একটু পর পর দেখা যেতে লাগলো স্বাস্থ্যবান একেকটা শূকর ভীত চোখেমুখে ব্যস্ত ছুটে জঙ্গলের দিকে যাচ্ছে। নেফ্রার স্ত্রী জিজ্ঞাস করলো, এতো শূকর কি মহলের মধ্যে ছিল? নেফ্রা হাসি হাসি মুখে বলল, উঁহু! গতরাত্রে জঙ্গল থেকে প্রাসাদ দখলে এসছিল এখন গ্রামে ফিরে যাচ্ছে, মানে জঙ্গলে।
মহলের ভেতর একজন কবি প্রবেশ করেছেন। তিনিও অরণ্যে ছিলেন এই বিদ্রোহের সাথে। রাজার বিরুদ্ধাচ্চারণ করে কবিতা লেখার অপরাধে তার ডানহাতের আঙুল কেটে ফেলা হয়েছিলো। কবির এই প্রাসাদে ফেরা একটা বিশেষ আগ্রহের কারণে। অন্ধ আচার্য পুরোহিতের নিয়ন্ত্রণে যেই রাজকীয় গ্রন্থগারটা আছে সেটা এক নজর দেখার। এখানে প্রাচীন সব দুর্লভ গ্রন্থের সংগ্রহ আছে। যার পাতায় পাতায় অজর জ্ঞানের ভিড়। কিন্তু কবিকে হতাশ হতে হয়েছে। প্রাসাদ পতনের উন্মাদনায় গ্রন্থাগার ভস্মীভূত করা হয়েছে, কিংবা আগুনে গ্রান্থাগার দাউদাউ করে অনেকক্ষণ জ্বলবে বলেই হয়তো সবার আগে এখানে আগুন দেয়া হয়েছিলো।
কবির ক্লান্ত লাগছে। পুরো প্রসাদ জুড়ে লুটপাট হচ্ছে। আধমরাদের মেরে ফেলা হচ্ছে। দাসীদের যৌন নিপীড়ন করা হচ্ছে। কেউ নেই এই মুহূর্তে কিছু বলার। কবির ঘৃণা লাগছে এইসব দেখে। কবি নিচে নেমে ঘুরে ঘুরে দেখলেন রাজার বিরাট চিড়িয়াখানাটা। জঙ্গলের হেন প্রাণী নেই যা সেখানে অনুপস্থিত। শুধুমাত্র কয়েক প্রজাতির বাঘ মিলিয়ে বাঘের সংখ্যা এগারোটি। কবি তার বাম হাতে খুব শান্ত ভঙ্গিতে, পাখিদের খাঁচা গুলো খুলে দিলেন। কিছুক্ষণের দ্বিধার পর ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ করে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি আকাশের দিকে বেরিয়ে গেলো। কবির মন অনেকদিনপর আনন্দে ভরে উঠলো। কিন্তু একফোঁটা সূক্ষ্ম দ্বিধার যন্ত্রণা তার মনের মধ্যে বাজতে লাগলো, মুক্তি কি সত্যিই এলো? ঠিক তখন এক দাসীকে টেনে হিঁচড়ে নামিয়ে নিয়ে যেতে লাগলো এক যুবক। অন্য একজন কেউ এগিয়ে এসে উল্টো মেয়েটার হাত ধরে টানাটানি করতে গিয়ে যুবকের সঙ্গে হাতাহাতিতে নেমে গেলো। কবির মনে হল, এই মানুষ গুলোও ভুলে গেছে তাদেরও যেকোন মুহূর্তে রাজার মতো পালানো লাগতে পারে সব ছেড়ে। কবি একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। কবির খুব ইচ্ছে হতে লাগলো গ্রামে ফিরে যেতে। সান্দ্রা নদীর জলে পা ডুবিয়ে বসে থাকতো যে জলে পা ডুবিয়ে অনেকক্ষণ বসে থাকলে একসময় পোনামাছের ঝাঁক এসে পায়ের পাতায় ঠোকরাতে থাকে। কবির চোখে জল এলো। একগুচ্ছ ফুল হাতে একদিন এক মেয়ে এই নদীর জলে ডুবে গিয়েছিলো। তার ডিঙি নৌকোটা পাওয়া গেলো পরেরদিন কিন্তু তাকে আর পাওয়া গেলো না। কবি তাকে দেখে নি শুনেছিলো শুধু। অথচ কবি জানে তার দেখা পাওয়া যাবে। তাই সে নদীর কিনারায় কতো কতো দিন বসে থেকেছে। প্রাসাদের সিঁড়ি থেকে আক্রান্ত দাসীটির বিকট চিৎকার শোনা গেলো। কবি বেরিয়ে যেতে পথ নিলেন। যাবার আগে কবি বাঘের খাঁচার কপাট খুলে দিলেন।
প্রচ্ছদঃ সুমন মুখার্জী